অংশীদারি ফার্মের আয়কর অডিট ও অ্যাসেসমেন্ট: একটি বাস্তব কেইস স্টাডি
আয়কর অডিট১২ মে, ২০২৬

অংশীদারি ফার্মের আয়কর অডিট ও অ্যাসেসমেন্ট: একটি বাস্তব কেইস স্টাডি

আয়কর অডিটে পড়লে কী হয়? শুধু জরিমানা নয় — সঠিক কমপ্লায়েন্স না থাকলে কোটি টাকার খরচ বাতিল হতে পারে, 'খেলাপি করদাতা' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি বাস্তব কেইস স্টাডি দেখে নেওয়া যাক।

প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি (Context & Legal Basis):

শুরুতেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই অডিট ও অ্যাসেসমেন্টটি ২০২১-২০২২ করবর্ষের। সেই সময়ে বাংলাদেশে 'ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪' (Income Tax Ordinance, 1984) প্রচলিত ছিল।

পটভূমি (Background):

করদাতা প্রতিষ্ঠানটি একটি অংশীদারি ফার্ম, যারা মূলত বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ (Supply of goods/Contractor) ব্যবসার সাথে জড়িত। আলোচ্য ২০২১-২০২২ করবর্ষের জন্য তারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করে। পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নির্দেশনায় ফাইলটি অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়।

অংশীদারি ফার্মের আয়কর কমপ্লায়েন্স না থাকলে NBR অডিটে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে, এই কেইস স্টাডিটি তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

১. ফাইলটি কেন অডিটে পড়ল বা অডিটের সূত্রপাত কীভাবে?

  1. TDS রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা: করদাতা ফার্ম আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী উৎসে কর কর্তনের (Withholding tax) কোনো বিবরণী বা রিটার্ন দাখিল করেনি।
  2. সন্দেহজনক হিসাব বিবরণী: করদাতা তাদের আয়কর রিটার্নের সাথে যে আয়-ব্যয় ও খরচের হিসাব দাখিল করেছিল, তার সাথে ব্যাংকিং লেনদেন ও উৎসে কর কর্তনের যথোপযুক্ত প্রমাণাদি সংযুক্ত ছিল না।

২. করদাতার দিক থেকে কী কী ভুল বা ব্যর্থতা ছিল?

আয়কর অডিটে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় TDS কর্তন ও ডকুমেন্টেশনের অভাবে। এই কেইসে করদাতার বেশ কিছু গুরুতর ভুল ছিল:

  1. শুনানিতে অসহযোগিতা: আয়কর কর্তৃপক্ষ থেকে বারবার শুনানির নোটিশ দেওয়া হলেও করদাতার পক্ষ থেকে কেউ হাজির হয়নি এবং সময়ের জন্য কোনো আবেদনও করেনি। ফলে নথিতে থাকা কাগজপত্রের ভিত্তিতে একতরফা রায় দেওয়া হয়।
  2. নগদ লেনদেন (Cash Transactions): আইন অনুযায়ী অফিস ভাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু করদাতা প্রায় ৪ লক্ষ টাকার অফিস ভাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলের বদলে নগদে পরিশোধ করেছে।
  3. খরচের সপক্ষে প্রমাণের অভাব (Lack of Vouchers): করদাতা তাদের লাভ-ক্ষতির হিসাবে বিদ্যুৎ বিল (প্রায় ৭৫ হাজার), যাতায়াত (প্রায় ৫০ হাজার), বিবিধ খরচ (প্রায় ৫০ হাজার) এবং স্টেশনারিজ (প্রায় ৭৫ হাজার) দাবি করেছিল। কিন্তু এর সপক্ষে তারা কোনো বিলের কপি বা প্রমাণপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হয়।
  4. তথ্য গোপন ও ব্যাংক বিবরণী দাখিল না করা: করদাতা তাদের ব্যাংক সুদ খাতে প্রায় আড়াই লক্ষ (২.৫ লক্ষ) টাকার খরচ দাবি করে। কিন্তু যে ব্যাংকগুলোর বিপরীতে এই সুদ দাবি করা হয়, সেই ব্যাংক হিসাবের কোনো বিবরণী (Bank Statement) তারা দাখিল করেনি।
  5. বিক্রয় বা আয়ের অংক গোপন করা (Concealment of Sales): করদাতা তাদের হিসাবে সরবরাহ খাত থেকে প্রাপ্তি বা বিক্রয় দেখিয়েছিল ৪.২০ কোটি টাকা। কিন্তু যে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির কাছে তারা পণ্য সরবরাহ করেছিল, সেই কোম্পানির দেওয়া প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে দেখা যায়, করদাতা আসলে প্রায় ৪.৬৫ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার বিক্রয় তারা রিটার্নে গোপন করেছিল।
  6. ব্যাংক জমার সাথে বিক্রয়ের অসামঞ্জস্যতা: করদাতার প্রদর্শিত বিক্রয় ছিল ৪.২০ কোটি টাকা, কিন্তু তাদের প্রদর্শিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর জমা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সেখানে মোট জমার পরিমাণ প্রায় ৪.৪৫ কোটি টাকা, যা বিক্রয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা বেশি। এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকায় অ্যাসেসিং অফিসার প্রায় ১০ লক্ষ টাকাকে 'খুচরা বিক্রয়' হিসেবে প্রাক্কলন করে আয়ের সাথে যোগ করেন।
  7. উৎসে কর (TDS) কর্তনে ব্যর্থতা: ফার্মটি প্রায় ৩ কোটি টাকার পণ্য ক্রয় এবং পরিবহন ও মেরামত বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করলেও, বিল পরিশোধের সময় তারা নিয়ম অনুযায়ী কোনো উৎসে কর (TDS) কর্তন করেনি।

৩. অ্যাসেসমেন্টের ফলাফল (Assessment Outcome):

যেহেতু করদাতা খরচের সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণাদি দাখিল করতে পারেনি, ব্যাংকিং চ্যানেলে ভাড়া পরিশোধ করেনি এবং খরচের বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর (TDS) কর্তন করেনি, তাই অ্যাসেসিং অফিসার আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর বিধান অনুযায়ী এই দাবি করা খরচগুলোকে অগ্রাহ্য (Disallow) করেন। এই বাতিলকৃত খরচের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি টাকার অধিক। এই বিপুল অংকের খরচ বাতিল হওয়ার কারণে ফার্মটির নিরূপিত আয় বহুগুণ বেড়ে যায় এবং এর ওপর ভিত্তি করে একটি বড় অংকের কর দাবি করা হয়।

নতুন আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী এই অ্যাসেসমেন্টটি কেমন হতো?

উপরোক্ত কেইস স্টাডিটি যদি বর্তমান আয়কর আইন, ২০২৩ এর অধীনে অডিট এবং অ্যাসেসমেন্ট করা হতো, তবে আইনি প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিম্নরূপ হতো:

  1. অডিট নির্বাচন ও একতরফা রায় (Best Judgement Assessment): বর্তমানে অডিট প্রক্রিয়াটি ধারা ১৮২ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ফার্মটি যদি অডিটের নোটিশ পেয়ে সহযোগিতা না করত এবং সংশোধিত রিটার্ন দাখিল না করত, তবে উপকর কমিশনার ধারা ১৮৪ এর অধীনে 'সর্বোত্তম বিচারিক কর নির্ধারণ' (Best judgement Assessment) এর মাধ্যমে একতরফাভাবে কর নির্ধারণ করতেন।
  2. ভাড়া নগদে পরিশোধ (Cash Transactions): আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ভাড়ার অর্থ ব্যাংক ট্রান্সফার ছাড়া অন্য কোনোভাবে পরিশোধ করলে তা সরাসরি অননুমোদনযোগ্য (Disallowed) ব্যয় হিসেবে বাতিল হয়ে যেত।
  3. ভাউচার বা প্রমাণের অভাব: আইন অনুযায়ী, হিসাবের খাতা নির্ধারিত নিয়মে না রাখলে এবং খরচের (বিদ্যুৎ, যাতায়াত, স্টেশনারি ইত্যাদি) সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ বা ভাউচার না থাকলে তা অননুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য হতো।
  4. TDS কর্তনে ব্যর্থতা ও 'খেলাপি করদাতা': নতুন আইনের সবচেয়ে কড়া বিধানগুলোর একটি হলো TDS। পণ্য সরবরাহ ও যাতায়াত বা স্টেশনারি খরচের বিপরীতে উৎসে কর কর্তন না করায় আইন অনুযায়ী প্রায় ৩ কোটি টাকার অধিক এই খরচগুলো সম্পূর্ণ বাতিল হতো। শুধু তাই নয়, ধারা অনুযায়ী ফার্মটিকে 'খেলাপি করদাতা' (Assessee-in-default) হিসেবে গণ্য করে, কর্তন না করা করের সমপরিমাণ অর্থ এবং তার ওপর মাসিক ২% হারে অতিরিক্ত জরিমানা আদায় করা হতো।
  5. বিশেষ ব্যবসা আয় (Special Business Income): আইনের অধীনে যেসব খরচ বাতিল করা হতো, তা ফার্মের 'বিশেষ ব্যবসা আয়' হিসেবে গণ্য হতো এবং এর বিপরীতে অন্য কোনো ক্ষতি সমন্বয় করা যেত না।
  6. আয় বা বিক্রয় গোপন করা (Concealment of Income): ৪৫ লক্ষ টাকার বিক্রয় গোপন এবং ব্যাংক জমার সাথে গরমিলের কারণে এটি 'কর ফাঁকি' হিসেবে বিবেচিত হতো। নতুন আইনের ধারা অনুযায়ী, আয় গোপনের জন্য ফাঁকি দেওয়া করের প্রেক্ষিতে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হতো।
  7. TDS রিটার্ন দাখিল না করা: একটি ফার্ম হিসেবে ধারা ১৭৭ অনুযায়ী উৎসে করের রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এটি দাখিল না করার কারণে আইন অনুযায়ী সর্বশেষ কর নির্ধারণের উপরন নির্দিষ্ট হারে এবং প্রতি মাসের বিলম্বের জন্য জরিমানা আরোপিত হতো।


এই কেইস স্টাডিটি শুধু একটি ফার্মের গল্প নয় — এটি বাংলাদেশের হাজার হাজার অংশীদারি ফার্ম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বাস্তবতা।

আয়কর আইন ২০২৩ পুরনো অধ্যাদেশের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। TDS কর্তন না করা, ভাউচার না রাখা, বা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেন করা — এই ভুলগুলো এখন শুধু খরচ বাতিলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং "খেলাপি করদাতা" হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং কোটি টাকার জরিমানার ঝুঁকি তৈরি করে।

আপনার ফার্মের আয়কর অডিট বা অ্যাসেসমেন্ট নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকলে, নোটিশ পাওয়ার আগেই একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবসময় সহজ।

শেয়ার করুন:

চেম্বারের ঠিকানা

মাহমুদুল হাসান বিজয়

চেম্বার

১৪ কাকরাইল, রমনা, ঢাকা।

গুগল ম্যাপে দেখুন

সাক্ষাতের সময়

রবিবার - বৃহস্পতিবার:

সকাল ১০:০০ - বিকাল ৫:০০

শুক্রবার ও শনিবার: বন্ধ

সরাসরি যোগাযোগ

01951252375
"চেম্বারে সাক্ষাতের জন্য অনুগ্রহ করে ফোনে সময় নির্ধারণ করে নিন। পরামর্শের জন্য প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সাথে আনা আবশ্যক।"