বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আয়কর
কর আইন১৭ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আয়কর

ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান ও সম্মানিত পেশা হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার পেশাদার আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য দূর থেকে কাজ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন — যা জাতীয় অর্থনীতিতে অর্থপূর্ণ অবদান রাখছে। তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে: বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের কি আয়কর দিতে হবে?

এর উত্তরটি বেশিরভাগ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম — এবং অনেক বেশি সুবিধাজনক। এই নির্দেশিকায়, আমি ব্যাখ্যা করব বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আয়কর সম্পর্কে বর্তমান আইন ঠিক কী বলে, কী কী শর্ত প্রযোজ্য এবং আপনার কী কী নথি সংরক্ষণ করতে হবে।

বড় খবর: ২০২৭ সাল পর্যন্ত আইটি ফ্রিল্যান্সিং আয় ১০০% করমুক্ত

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি রয়েছে যা প্রত্যেক বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারের জানা উচিত: বর্তমান আইন অনুযায়ী আইটি ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয় আয়কর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। 

আয়কর আইন ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, আবাসিক বা অনাবাসিক বাংলাদেশী ব্যক্তি করদাতাদের আয়কর ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয় ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত।

✓ মূল বিষয়: এই ছাড়ের ক্ষেত্রে আয়ের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই। আপনি আয়কর ফ্রিল্যান্সিং থেকে ৫ লাখ টাকা বা ৫০ লাখ টাকা যা-ই আয় করুন না কেন, নিচের শর্তগুলো পূরণ সাপেক্ষে সম্পূর্ণ অর্থই করমুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

এটি একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা যা বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের অন্যান্য স্বনির্ভর পেশাজীবীদের তুলনায় অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। তবে, এই ছাড়টি শর্তসাপেক্ষ।

কর ছাড়ের জন্য যোগ্যতার শর্তাবলী:

বাংলাদেশে ১০০% আইটি ফ্রিল্যান্সিং কর ছাড় দাবি করার জন্য, আপনাকে দুটি বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত পূরণ করতে হবে:

১. আয়ের ১০০% অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসতে হবে

আইটি ফ্রিল্যান্সিং ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পূর্ণ আয় অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসতে হবে। নগদে ফ্রিল্যান্স পেমেন্ট গ্রহণ করলে আপনি এই ছাড়ের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

২. বৈদেশিক আয় অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসতে হবে

যেহেতু বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে আসে, তাই বিদ্যমান বৈদেশিক রেমিটেন্স আইন অনুযায়ী তা অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠাতে হবে। অনানুষ্ঠানিক স্থানান্তর পদ্ধতি (হুন্ডি, ক্রিপ্টো, ইত্যাদি) আপনাকে এই ছাড়ের জন্য অযোগ্য করে তুলবে।

যদি কোনো একটি শর্ত পূরণ না হয়, তবে আয়টি তার করমুক্ত অবস্থা হারাতে পারে এবং প্রযোজ্য স্ল্যাব হারে নিয়মিত আয়করের আওতায় চলে আসতে পারে।

ফ্রিল্যান্সারদের কি এখনও ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে?

এখানেই বাংলাদেশের অনেক ফ্রিল্যান্সার বিভ্রান্ত হন। উত্তর হলো: হ্যাঁ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনার আয় করমুক্ত হলেও আপনাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। 

যদি আপনার একটি টিআইএন (TIN) থাকে অথবা আপনি আয়কর আইন ২০২৩-এর অধীনে বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের কোনো বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হন, তাহলে আপনার কোনো কর বকেয়া থাকুক বা না থাকুক, আপনাকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আপনার আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ: রিটার্ন দাখিল করার সময়, আপনার ফ্রিল্যান্সিং আয়কে করযোগ্য আয়ের কলামে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। পরিবর্তে, এটি অবশ্যই রিটার্ন ফর্মের "করমুক্ত আয়" বা "কর ছাড়ের যোগ্য আয়" বিভাগে সঠিকভাবে দেখাতে হবে। এটিকে ভুলভাবে করযোগ্য আয় হিসাবে দেখালে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

কর দাখিলের জন্য ফ্রিল্যান্সারদের কী কী নথিপত্র প্রয়োজন?

বাংলাদেশে রিটার্ন দাখিল করার সময় ফ্রিল্যান্সার কর ছাড় সঠিকভাবে দাবি করার জন্য, আপনাকে নিম্নলিখিত নথিগুলি প্রস্তুত করে সংযুক্ত করতে হবে:

  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট: এটি প্রমাণ করে যে আপনার সমস্ত ফ্রিল্যান্সিং আয় (১০০%) ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছে, যা সংশোধিত কর আইনের অধীনে ছাড়ের জন্য প্রাথমিক শর্ত।
  • ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট / এনক্যাশমেন্ট সার্টিফিকেট: আপনার ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত; এটি প্রমাণ করে যে বৈদেশিক আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এসেছে।
  • আয় বিবরণী / উপার্জনের সারাংশ: উৎস এবং পরিমাণ অনুযায়ী ফ্রিল্যান্সিং আয়ের বিস্তারিত বিবরণ। যেহেতু এটি ব্যবসা/পেশা খাতের অধীনে পড়ে, তাই একটি সাধারণ আয়-ব্যয় বিবরণী প্রয়োজন হতে পারে।
  • টিআইএন সার্টিফিকেট: সকল ফাইলারের জন্য আবশ্যক।
  • প্ল্যাটফর্ম উপার্জনের রেকর্ড: আপওয়ার্ক, ফাইভার বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে বছরের মোট উপার্জন প্রদর্শনকারী স্ক্রিনশট বা পিডিএফ এক্সপোর্ট।

বাংলাদেশে কর সংক্রান্ত বিষয়ে ফ্রিল্যান্সারদের সাধারণ ভুলসমূহ:

  • রিটার্ন দাখিল না করা — করমুক্ত আয়ও রিপোর্ট করতে হবে; সম্পূর্ণভাবে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা হতে পারে।
  • ভুল কলামে আয় দেখানো — করমুক্ত আয়কে করযোগ্য আয় হিসাবে দেখালে অপ্রয়োজনীয় কর দায় তৈরি হয়।
  • অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ — এটি আপনাকে সম্পূর্ণভাবে করমুক্তির অযোগ্য করে তোলে।
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট না রাখা — এগুলো ছাড়া আপনি ব্যাংক ট্রান্সফার শর্ত পূরণের প্রমাণ দিতে পারবেন না।
  • রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ মিস করা — আপনাকে অবশ্যই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আপনার রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে আপনার কর অব্যাহতির মর্যাদা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যাবে।
  • অব্যাহতিটি স্থায়ী মনে করা — বর্তমান অব্যাহতিটি ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে; এরপর নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে।
    ⚠️ সতর্কবার্তা / বিশেষ দ্রষ্টব্য: আয়কর আইন ও এর বিভিন্ন ধারা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন বা সংশোধনযোগ্য। এই ব্লগে প্রদত্ত তথ্যগুলো বর্তমান আয়কর আইনের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। তাই আয়কর সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট ও সঠিক তথ্য জানার জন্য সর্বদা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (www.nbr.gov.bd) অনুসরণ করুন অথবা একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

শেয়ার করুন:

চেম্বারের ঠিকানা

মাহমুদুল হাসান বিজয়

চেম্বার

১৪ কাকরাইল, রমনা, ঢাকা।

গুগল ম্যাপে দেখুন

সাক্ষাতের সময়

রবিবার - বৃহস্পতিবার:

সকাল ১০:০০ - বিকাল ৫:০০

শুক্রবার ও শনিবার: বন্ধ

সরাসরি যোগাযোগ

01951252375
"চেম্বারে সাক্ষাতের জন্য অনুগ্রহ করে ফোনে সময় নির্ধারণ করে নিন। পরামর্শের জন্য প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সাথে আনা আবশ্যক।"