
ব্যবসা ও পেশা খাতের কর ব্যবস্থা এবং টার্নওভার ট্যাক্সের বিশ্লেষণ
- ব্যবসা ও পেশার আয় এখন একই খাতের (Income from Business or Profession) আওতায়।
- ব্যবসা ও পেশার আয়ের ওপর ন্যূনতম টার্নওভার ট্যাক্স এখন আর ফ্ল্যাট ১% নয় — বাৎসরিক টার্নওভার ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে কোনো টার্নওভার ট্যাক্স নেই (০%), ২ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ০.৫০%, এবং ৪ কোটি টাকার বেশি হলে ১% হারে টার্নওভার ট্যাক্স প্রযোজ্য হবে (এনবিআর SRO-324, ৩১ আগস্ট ২০২৬ থেকে কার্যকর)।
- খুচরা ব্যবসায়ীদের পণ্য ক্রয়ে নতুন ০.২% অগ্রিম কর কর্তন এবং ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে অনলাইন "এ-চালান" বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় ২০২৬ সালের নতুন অর্থ আইন এবং আয়কর আইনের সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা দেশের করদাতাদের ব্যবসায়িক ও পেশাগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
এই বছরের আয়কর আইনের সবচেয়ে মৌলিক পরিবর্তনটি হলো—আয়কর আইনে ব্যবসা এবং পেশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়েছে। ইতিপূর্বে চিকিৎসকেরা চেম্বার থেকে, আইনজীবীরা ওকালতি থেকে কিংবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টরা ফার্ম থেকে যে আয় করতেন, তা প্রায়শই "অন্যান্য উৎসের আয়" বা পৃথক একটি অস্পষ্ট ক্যাটাগরিতে পরিগণনা করা হতো, যা নিয়ে করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তির শেষ ছিল না। নতুন আইনে এই সমস্ত স্বাধীন পেশাজীবী—যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, চার্টার্ড সেক্রেটারি, কনসালটেন্ট ইত্যাদি পেশাগত আয়কে সরাসরি "ব্যবসা ও পেশা হতে আয়" (Income from Business or Profession) খাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে একদিকে যেমন পেশাজীবীদের জন্য কর পরিগণনার নিয়ম ও বৈধ খরচ বাদ দেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট ও সহজ হয়েছে, অন্যদিকে তাঁদের ওপর হিসাব রক্ষণ ও অডিট কমপ্লায়েন্সের আইনি বাধ্যবাধকতাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা ছাড়া অন্যান্য করদাতার বাৎসরিক টার্নওভার যদি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দ্বারা অডিট করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবসা বা পেশা থেকে আয় থাকলে নিজেদের চেম্বার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (PSR) ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম অমান্য করলে ন্যূনতম ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
অডিট ও আয় পরিগণনাপত্র দাখিলের নতুন নিয়ম
ব্যবসায়ী বা স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে যারা এককভাবে অথবা অংশীদারি ফার্মের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তাঁদের জন্য অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে অডিটের নিয়মে একটি চমৎকার শৃঙ্খলা আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে আপনি যদি একক মালিকানাধীন বা প্রোপরাইটরশিপ ব্যবসা পরিচালনা করেন (যাঁরা স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা হিসেবে গণ্য), তবে আপনার বাৎসরিক টার্নওভার বা মূলধন যতই হোক না কেন, রিটার্নের সাথে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দ্বারা অডিটেড ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে, ব্যক্তি করদাতার যদি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে ব্যবসায়িক আয় অর্জিত হয়ে থাকে, কেবল তখনই অডিট রিপোর্টের প্রয়োজন পড়বে। অংশীদারি ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ এবং হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের (HUF) ক্ষেত্রে অডিটের নিয়মটি অনেক স্পষ্ট করা হয়েছে। নতুন নিয়মে এই শ্রেণীর করদাতাদের বাৎসরিক টার্নওভার যদি ১০ কোটি টাকা অতিক্রম করে অথবা ব্যবসায়িক মূলধন ৫ কোটি টাকার বেশি হয়, কেবল তখনই রিটার্নের সাথে ১. চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Chartered Accountant - CA) অথবা ২. কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Cost and Management Accountant - CMA) অথবা ৩. আয়কর আইনজীবী (Income Tax Lawyer) দ্বারা নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এই সীমার নিচে থাকলে অংশীদারি ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘের জন্য অডিট রিপোর্টের প্রয়োজন পড়বে না।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারটি হলো—অডিটের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, বাৎসরিক টার্নওভার বা মূলধন যতই কম হোক না কেন, দেশের প্রতিটি অংশীদারি ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের জন্য তাঁদের বাৎসরিক আয়কর রিটার্নের সাথে নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট অথবা অনুমোদিত আয়কর আইনজীবী দ্বারা প্রত্যয়িত সুনির্দিষ্ট "আয় পরিগণনাপত্র" (Income Computation Sheet) দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ব্যবসায়ের অনুমোদনযোগ্য খরচ ও বিয়োজন নীতিঃ
ব্যবসা বা পেশা খাতের প্রকৃত করযোগ্য নিট আয় নির্ধারণ করার জন্য করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন খরচগুলো তাঁরা আইনগতভাবে ব্যবসার আয় থেকে বাদ দিতে পারবেন।
- কাঁচামাল বা পণ্য ক্রয় সংক্রান্ত খরচ ব্যবসার প্রধান অনুমোদনযোগ্য খরচ, তবে কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে এককালীন ৫ লক্ষ টাকার বেশি নগদ বা ক্যাশ লেনদেন করা হলে তা ব্যবসার খরচ হিসেবে অননুমোদিত হবে এবং আইন অনুযায়ী তা বিশেষ ব্যবসায়িক আয় হিসেবে নিয়মিত হারে করযোগ্য হবে।
- ব্যবসা বা পেশার কার্যালয়, শোরুম বা ফ্যাক্টরির জন্য পরিশোধিত ভাড়ার সম্পূর্ণ খরচটি অনুমোদনযোগ্য হলেও তা অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় ভাড়ার সম্পূর্ণ খরচটি অননুমোদিত ব্যয় হিসেবে গণ্য হয়ে ব্যবসার আয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে।
- কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে তা অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
- বিজ্ঞাপনের বাইরে নগদ বা উপহারের মাধ্যমে করা অন্যান্য প্রচারণামূলক বা প্রোমোশনাল খরচের সর্বোচ্চ সীমা অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে বাৎসরিক টার্নওভারের সরাসরি ১% করা হয়েছে, যা ব্যবসা প্রসারে করদাতাদের কর ছাড়ের সুযোগ অনেক বাড়িয়ে দেবে।
- আপ্যায়ন খরচের ক্ষেত্রেও পূর্বের ধাপে ধাপে জটিল হিসাব বাতিল করে অত্যন্ত সহজ নিয়ম করা হয়েছে, যার অধীনে আপ্যায়ন ব্যয় বিয়োজন ব্যতীত নিরূপিত আয়ের সর্বোচ্চ ৪% অথবা করদাতার দাবিকৃত প্রকৃত আপ্যায়ন খরচ, এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম হবে, সেই পরিমাণ ব্যবসার খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।
এছাড়াও, ব্যবসা বা পেশা পরিচালনায় প্রাসঙ্গিক অন্যান্য নিয়মিত খরচগুলোকেও ব্যবসার বৈধ খরচ হিসেবে আয়কর আইন অনুযায়ী বিয়োজন করার স্পষ্ট আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই খরচগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—
- ব্যবসায়িক মালামাল বা সম্পদ সুরক্ষার জন্য পরিশোধিত বীমা প্রিমিয়াম এবং অফিস, আসবাবপত্র, চেম্বার বা ফ্যাক্টরি মেরামতের প্রকৃত ব্যয়।
- কার্যালয় বা কারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা ফুয়েল বিলের প্রকৃত পরিশোধিত অর্থ ব্যবসার খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।
- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য আয়োজিত পেশাগত প্রশিক্ষণ ব্যয়, ব্যবসার মালামাল সংগ্রহ বা সাধারণ যাতায়াতের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত যাতায়াত ও ভ্রমণ খরচ, এবং ব্যবসার নিয়মিত যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ইন্টারনেট, মোবাইল ও ডাক বা কুরিয়ার বিলের বাৎসরিক ব্যয়ের অর্থ ব্যবসার খরচ হিসেবে দাবি করা যাবে।
- হিসাব নিরীক্ষার জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টদের অডিট ফি, কর আইনজীবীদের প্রফেশনাল ফি, ব্যবসার যেকোনো আইনি লড়াইয়ের ব্যয়, এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে সংঘটিত প্রকৃত লোকসান ব্যবসার খরচ হিসেবে সমন্বয়যোগ্য।
- ব্যবসার বকেয়া পাওনার যে অংশটি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরও আদায় করা সম্ভব হয়নি এবং কুঋণ বা মন্দ ঋণ (Bad Debt) হিসেবে লিখে ফেলা হয়েছে, তা কর কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যবসার খরচ হিসেবে বিয়োজন করা যাবে।
- ব্যবসা বা পেশা পরিচালনার সুবিধার্থে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে নেওয়া ঋণের ওপর বাৎসরিক পরিশোধিত সুদ বা মুনাফার অর্থ এবং ব্যবসার জন্য কেনা আসবাবপত্র, দালানকোঠা বা ভারী যন্ত্রপাতির অবচয় বা অবলোপন ভাতা (Depreciation & Amortization) ব্যবসার অন্যতম প্রধান বাদযোগ্য খরচ হিসেবে গণ্য হবে।
- পাশাপাইশি এই সুনির্দিষ্ট খরচগুলোর বাইরেও যদি করদাতা প্রমাণ করতে পারেন যে কোনো নির্দিষ্ট খরচ সম্পূর্ণরূপে এবং শুধুমাত্র ব্যবসা বা পেশার স্বার্থেই করা হয়েছে, তবে কর কর্মকর্তা তা ব্যবসার সাধারণ ব্যয় হিসেবে অনুমোদন করবেন।
খুচরা বিক্রেতা বা রিটেইল ব্যবসার জন্য পণ্য ক্রয়ে নতুন অগ্রিম করঃ
দেশের খুচরা ব্যবসা খাতকে আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে এবং করের জাল বিস্তৃত করতে অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে মূল আয়কর আইনে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী নতুন ধারা ১৩০ক (Section 130A) সংযোজন করা হয়েছে। এই নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো পণ্য উৎপাদক বা ম্যানুফ্যাকচারার, আমদানিকারক, পরিবেশক, সরবরাহকারী বা আড়তদার যখন কোনো খুচরা বিক্রেতার (Retailer) কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করবেন, তখন সেই বিক্রয় বা সরবরাহের বিপরীতে প্রস্তুতকৃত বিল বা চালানের মোট মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ০.২% (শূণ্য দশমিক দুই শতাংশ) হারে অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ বা কেটে রাখবেন।
এই কেটে রাখা অগ্রিম করটি খুচরা বিক্রেতাদের জন্য কোনো চূড়ান্ত করদায় নয়, বরং এটি বছর শেষে তাঁদের নিয়মিত করদায়ের সাথে সমন্বয়ের যোগ্য।
ধরা যাক, একজন খুচরা মুদি দোকানদার বা কাপড়ের রিটেইলার কোনো বড় পরিবেশক বা কোম্পানির কাছ থেকে বাৎসরিক মোট ৫০,০০,০০০ টাকার মালামাল স্টক করার জন্য ক্রয় করলেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মালামাল সরবরাহের সময় কোম্পানি উক্ত চালানের ওপর অতিরিক্ত ০.২% অর্থাৎ ১০,০০০ টাকা অগ্রিম কর হিসেবে সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। খুচরা বিক্রেতা বছর শেষে যখন তাঁর আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন, তখন তিনি এই ১০,০০০ টাকা অগ্রিম কর (Advance Tax) হিসেবে প্রদর্শন করে তাঁর মূল করদায় থেকে সরাসরি বাদ দিতে পারবেন। এর ফলে ছোট বড় সকল খুচরা বিক্রেতার ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য কর ফাইলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ রাখা সহজ হবে।
টার্নওভার ট্যাক্স এবং এসএমই খাতের ওপর এর প্রভাবঃ
ব্যবসায়ীদের কর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ হলো ধারা ১৬৩(৫) অনুযায়ী আরোপিত ন্যূনতম কর বা টার্নওভার কর। অর্থ আইন, ২০২৬-এ প্রাথমিকভাবে সাধারণ ব্যবসা ও লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবসায় লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে বাৎসরিক মোট গ্রস প্রাপ্তি বা টার্নওভারের ওপর ফ্ল্যাট ১% ন্যূনতম কর বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ী মহলের ব্যাপক আপত্তি ও FBCCI-এর আনুষ্ঠানিক দাবির প্রেক্ষিতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন (এসআরও নং ৩২৪-আইন/আয়কর-০৫/২০২৬) জারি করে ধারা ১৬৩(৬)-এর সারণিতে উল্লিখিত ১% টার্নওভার করের নিয়মটি বাতিল করেছে। এই সংশোধনীর ফলে এখন থেকে টার্নওভার কর আর ফ্ল্যাট হারে নয়, বরং ব্যবসার আকার অনুযায়ী তিনটি ধাপে (Tiered Structure) নির্ধারিত হবে।
নতুন হার অনুযায়ীঃ
- বাৎসরিক গ্রস প্রাপ্তি বা টার্নওভার ২ (দুই) কোটি টাকা পর্যন্ত হলে — কোনো টার্নওভার ট্যাক্স প্রযোজ্য হবে না (০%) ।
- বাৎসরিক টার্নওভার ২ কোটি টাকার অধিক তবে ৪ (চার) কোটি টাকার অধিক নয়, এমন ক্ষেত্রে — টার্নওভারের ০.৫০% হারে কর প্রযোজ্য হবে।
- বাৎসরিক টার্নওভার ৪ কোটি টাকার অধিক হলে — পূর্বের মতোই টার্নওভারের ১% হারে কর প্রযোজ্য হবে।

এই সংশোধনী প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকেই অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। উল্লেখ্য, এই সাধারণ হারের বাইরে বিশেষ কিছু খাতের জন্য আলাদা হার এখনও বহাল রয়েছে — তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে এই করের হার ৩%, কার্বনেটেড বেভারেজ ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে ২.৫%, এবং মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনটিটিএন (NTTN) প্রতিষ্ঠানের জন্য ১.৫% প্রযোজ্য হবে। তবে উৎপাদনে নিয়োজিত নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর প্রথম ৩ বছরের জন্য এই করের হার হ্রাস করে মাত্র ০.২% করা হয়েছে; একই সাথে অর্থ আইনের বিশেষ প্রোভিসো বা শর্তানুযায়ী কোনো সরকারি সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশন কর্তৃক সার, বীজ অথবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানি, বিতরণ বা খোলা বাজারে বিক্রয়, কমিশন ব্যবসা, ডিও (Delivery Order) ব্যবসা, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা, এবং স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক বা প্ল্যাটিনাম ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসাকে এই টার্নওভার কর বা ন্যূনতম করের আওতা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রজ্ঞাপনে টার্নওভার কর কেমন হবে, একটু উদাহরণ দিয়ে দেখা যাক—
উদাহরণ–১: কোনো ব্যবসায়ীর বার্ষিক টার্নওভার ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যেহেতু এটি ২ কোটি টাকার সীমার মধ্যেই আছে, তাই টার্নওভার কর হচ্ছে শূন্য টাকা।
উদাহরণ–২: ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ীর টার্নওভার ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এটি ২ কোটির বেশি কিন্তু ৪ কোটির কম হওয়ায়, পুরো ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ওপর ০.৫০% হারে টার্নওভার কর হচ্ছে— ৩,৫০,০০,০০০ × ০.৫০% = ১,৭৫,০০০ টাকা। লক্ষণীয়, শুধু ২ কোটির অতিরিক্ত অংশের ওপর নয়—পুরো অঙ্কের ওপরই এই হার প্রযোজ্য।
উদাহরণ–৩: এবার ধরুন, টার্নওভার ৬ কোটি টাকা। যেহেতু এটি ৪ কোটির সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তাই পুরো ৬ কোটি টাকার ওপর ১% হারে টার্নওভার কর হচ্ছে— ৬,০০,০০,০০০ × ১% = ৬,০০,০০০ টাকা। এখানেও একই নিয়ম— ৪ কোটির উপরের অংশে নয়, বরং সম্পূর্ণ টার্নওভারের ওপর এই হার বসবে।
তবে মনে রাখতে হবে, টার্নওভার কর শূন্য হওয়া মানে ব্যবসার নিয়মিত আয়করও শূন্য—এমন নয়। ব্যবসার করযোগ্য আয় থাকলে প্রচলিত নিয়মে আয়কর হিসাব করতে হবে।
ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্টদের ও ইটভাটার কর কাঠামো কর ব্যবস্থাঃ
আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে জড়িত বিশেষায়িত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট এবং শিপিং এজেন্টদের জন্য কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান কার্যকর রয়েছে। আয়কর আইনের ধারা ১২২ অনুযায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের লাইসেন্স নবায়ন এবং পণ্য খালাসের সময় প্রাপ্ত কমিশনের ওপর সরাসরি ১০% (দশ শতাংশ) হারে উৎসে কর কর্তন করা হয়ে থাকে। কিন্তু ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এবং শিপিং এজেন্টদের ক্ষেত্রে অর্থ আইন, ২০২৬-এর সংশোধিত ধারা ১২৪-এর মাধ্যমে উৎসে কর আদায়ের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ ফর্মুলা প্রবর্তন করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট বা শিপিং এজেন্ট কর্তৃক প্রাপ্ত মোট গ্রস বিলের ১% (এক শতাংশ) অথবা উক্ত এজেন্টের ইনভয়েসে যদি কমিশন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে তবে উক্ত কমিশনের ১০% (দশ শতাংশ)—এই দুইটির মধ্যে হিসাব কষে যে পরিমাণ করের অংকটি বেশি হবে, সেই হারেই উৎসে কর কর্তন করতে হবে।
বিষয়টি একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক। ধরা যাক, একটি শিপিং এজেন্সি বিদেশ থেকে ১ কোটি টাকার একটি গ্রস বিল পেল, যার ইনভয়েসে এজেন্টের নিজস্ব কমিশন হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে ৫ লক্ষ টাকা আলাদা করে উল্লেখ আছে। এখন করের হিসাব কষলে দেখা যাবে, কমিশনের ১০% হিসেবে করের পরিমাণ আসে ৫০,০০০ টাকা এবং সম্পূর্ণ গ্রস বিলের ১% হিসেবে করের পরিমাণ আসে ১,০০,০০০ টাকা। যেহেতু গ্রস বিলের ১% অর্থাৎ ১ লক্ষ টাকা কমিশনের ১০% (৫০ হাজার টাকা) অপেক্ষা বেশি, তাই ব্যাংক এই বিল ছাড় করার সময় সরাসরি ১ লক্ষ টাকা উৎসে কর হিসেবে কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। এই নিয়মের ফলে এজেন্সির প্রকৃত লেনদেনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিকভাবে কর কর্তন নিশ্চিত হয়।
পাশাপাশি ইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটাগুলোর লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নের সময় পরিবেশ বিপর্যয় রোধ ও কর আদায়ের লক্ষ্যে আইনের ধারা ১৩০-এর অধীনে অগ্রিম আয়কর আদায়ের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর নতুন প্রতিস্থাপিত ধারা ১৩০ অনুযায়ী, ইটভাটাগুলোর সেকশন বা ঘনফুটের ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে যথাক্রমে ১ লক্ষ টাকা, ১.৫ লক্ষ টাকা, ২ লক্ষ টাকা এবং ৩ লক্ষ টাকা বাৎসরিক অগ্রিম কর এ-চালানের মাধ্যমে পরিশোধের প্রমাণক দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো ইটভাটা মালিক যদি যথাসময়ে এই বাৎসরিক অগ্রিম কর পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে পরবর্তী বছর নবায়নের সময় তাঁকে পূর্ববর্তী বকেয়া করের সমপরিমাণ টাকা জরিমানা সহ আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ কর পরিশোধ করে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।
ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় এলাকাভিত্তিক উৎসে কর ও এ-চালানের বাধ্যবাধকতাঃ
যেকোনো ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক ভিত্তি হলো ট্রেড লাইসেন্স। আয়কর আইনের ধারা ১৩১ অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তাঁদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করার সময় এলাকা এবং ব্যবসার অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট হারে অগ্রিম উৎসে কর পরিশোধ করতে হয়। এই অগ্রিম করের হার নিম্নরূপ সাজানো হয়েছে
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য অগ্রিম কর ৩,০০০ (তিন হাজার) টাকা।
- দেশের অন্যান্য যেকোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রিম কর ২,০০০ (দুই হাজার) টাকা।
- জেলা সদরে অবস্থিত যেকোনো পৌরসভার (Pourashava Sadar) জন্য অগ্রিম করের হার ১,০০০ (এক হাজার) টাকা।
- অন্যান্য যেকোনো গ্রামীণ বা সাধারণ পৌরসভার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রিম করের হার ৫০০ (পাঁচশত) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের এই অগ্রিম কর পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন অর্থ আইনের মাধ্যমে একটি বড় প্রশাসনিক কঠোরতা আনা হয়েছে। পূর্বে এই ট্যাক্সের টাকা যেকোনো ব্যাংকের পে-অর্ডার বা লোকাল ম্যানুয়াল চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা যেত, কিন্তু বর্তমান নিয়মে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের অগ্রিম করের সম্পূর্ণ টাকাটি বাধ্যতামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট অনলাইন এ-চালানের (a-Challan) মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। এ-চালানের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সফল ডিজিটাল রসিদ ছাড়া কোনো সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করবে না। এই অগ্রিম কর বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, অর্থ আইন, ২০২৬-এর এই সুদূরপ্রসারী সংশোধনীসমূহ দেশের কর ব্যবস্থাকে একদিকে যেমন ডিজিটালাইজেশন ও শৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে করদাতাদের—বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্বাধীন পেশাজীবীদের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সাথে, নতুন ধারা ১৩০ক-এর অধীনে খুচরা ক্রয়ে ০.২% অগ্রিম কর আদায়ের মতো বিষয়গুলো অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসার কার্যকরী উদ্যোগ। তবে পূর্বের ১% ফ্ল্যাট টার্নওভার ট্যাক্সের কারণে লোকসানের মুখেও ব্যবসায়ীদের ওপর যে বিপুল করের বোঝা ও কার্যকরী মূলধন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, নতুন সংশোধনী তা অনেকাংশে প্রশমিত করেছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ১% টার্নওভার ট্যাক্স কি লোকসান হলেও দিতে হবে?
হ্যাঁ, টার্নওভার কর ব্যবসায় লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে প্রযোজ্য — এটাই এই করের মূল বৈশিষ্ট্য। তবে ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী হারে পরিবর্তন এসেছে। বাৎসরিক টার্নওভার ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে কোনো টার্নওভার কর দিতে হবে না। টার্নওভার ২-৪ কোটি টাকার মধ্যে হলে ০.৫০% এবং ৪ কোটি টাকার বেশি হলে ১% হারে টার্নওভার কর দিতে হবে — লোকসান হলেও।
প্রশ্ন: খুচরা বিক্রেতা বা রিটেইলারদের পণ্য ক্রয়ে নতুন ০.২% অগ্রিম করের নিয়মটি কী?
কোনো খুচরা বিক্রেতা যখন বড় উৎপাদক, আমদানিকারক, পরিবেশক বা আড়তদার থেকে সরাসরি পণ্য কিনবেন, তখন কোম্পানি তাদের চালানের মোট মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ০.২% অগ্রিম কর কেটে রাখবে।
প্রশ্ন: ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে কত টাকা অগ্রিম কর দিতে হয়?
ঢাকা/চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ৩,০০০ টাকা, অন্য সিটি কর্পোরেশনে ২,০০০ টাকা, জেলা সদর পৌরসভায় ১,০০০ টাকা এবং সাধারণ পৌরসভায় ৫০০ টাকা — বাধ্যতামূলকভাবে এ-চালানের মাধ্যমে।