
স্বর্ণ বা গহনা বিক্রিতে আয়কর ২০২৬-২৭: TDS, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ও নতুন নিয়মে যা পরিবর্তন আসতে পারে
- ব্যক্তিগত স্বর্ণ/রৌপ্য/অলংকার বিক্রির মুনাফা এখন করযোগ্য।
- মুনাফার ওপর ফ্ল্যাট ৫% কর।
- বিক্রির সময় ০.৫% TDS কর্তন হবে, যা পরে সমন্বয়যোগ্য।
(৩০শে জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত অর্থ আইন ২০২৬ অনুসারে)
দৈনন্দিন জীবনে বিপদে-আপদে কিংবা নতুন ডিজাইনের গহনা বানাতে পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করা আমাদের কাছে খুবই সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু জানেন কি, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত চূড়ান্ত 'অর্থ আইন, ২০২৬'-এ স্বর্ণ বিক্রির ওপর ট্যাক্সের বিষয়ে একটি বড় পরিবর্তন এনে তা পাস করা হয়েছে।
১. আগে কেমন ছিল, এখন কেমন হতে পারেঃ
আগে: আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত ব্যবহারের অলংকার 'মূলধনী সম্পদ' (Capital Asset)-এর সংজ্ঞার বাইরে ছিল। ফলে স্বর্ণ, রৌপ্য, অলংকার বা রত্ন-হীরক বিক্রিতে কোনো কর দিতে হতো না।
এখন: চূড়ান্ত 'অর্থ আইন, ২০২৬' এ আয়কর আইনের ধারায় পরিবর্তন এনে ব্যক্তিগত স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক, ধাতব মুদ্রা, মূল্যবান ধাতু বা চিত্রকর্ম হস্তান্তর থেকে অর্জিত মুনাফাকে স্পষ্টভাবে "মূলধনী মুনাফা" (Taxable Capital Gain) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করে লাভ হলে তার ওপর আইন অনুযায়ী কর দিতে হবে।
২. বিক্রির সময় উৎসে কর (TDS) কর্তনঃ
জুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণ বিক্রি করলে নতুন যুক্ত হওয়া ধারা অনুযায়ী আপনি যখন কোনো জুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে আপনার পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করতে যাবেন, তখন ব্যবসায়ী মোট বিক্রয়মূল্যের ওপর ০.৫% (শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ) হারে উৎসে কর (TDS) কেটে রেখে সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন।
উদাহরণ: আপনি যদি জুয়েলারি দোকানে ১০,০০,০০০ (১০ লাখ) টাকার স্বর্ণ বিক্রি করেন, তবে দোকানদার আপনার থেকে ০.৫% হারে অর্থাৎ ৫,০০০ টাকা কর কেটে রাখবেন এবং আপনাকে নিট ৯,৯৫,০০০ টাকা পরিশোধ করবেন। এই কেটে রাখা ৫,০০০ টাকার জন্য জুয়েলার্স আপনাকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করবে যা আপনার চূড়ান্ত করদায়ের সাথে সমন্বয় করা যাবে।
৩. মুনাফার ওপর করের হার পাঁচ শতাংশঃ
বাজেটের খসড়া প্রস্তাবে স্বর্ণ বিক্রির লাভের ওপর সর্বোচ্চ ১৫% পর্যন্ত করের প্রস্তাব করা হলেও, সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে চূড়ান্ত গেজেটে করের হার অনেক কমানো হয়েছে।
গেজেটের চূড়ান্ত তফসিল অনুযায়ী, ব্যবসায়িক পণ্য নয় এমন ব্যক্তিগত স্বর্ণ, রৌপ্য বা অলংকার বিক্রির মূলধনী আয়ের ওপর ফ্ল্যাট মাত্র ৫% (পাঁচ শতাংশ) কর প্রযোজ্য হবে। এখানে স্বর্ণটি কত বছর আপনার কাছে ছিল (Holding Period) তার ওপর ভিত্তি করে করের হার পরিবর্তন হবে না।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ৫ ভরি স্বর্ণ ১০,০০,০০০ টাকায় বিক্রি করলেন এবং গহনাটি তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন (যার অর্জন মূল্য শূন্য)। এক্ষেত্রে তার মোট মূলধনী আয়: ১০,০০,০০০ টাকা। চূড়ান্ত গেজেট অনুযায়ী ৫% ফ্ল্যাট কর: ৫০,০০০ টাকা। বিক্রির সময় জুয়েলারি দোকানদার আগেই উৎসে কর কেটে রেখেছেন: ৫,০০০ টাকা (০.৫% TDS) ।
সুতরাং, চূড়ান্ত প্রদেয় কর: ৫০,০০০ − ৫,০০০ = ৪৫,০০০ টাকা।
পরামর্শঃ
এখন থেকে স্বর্ণ বিক্রির লাভ করযোগ্য আয়, তাই মুনাফার সঠিক হিসাবের জন্য স্বর্ণ কেনার পুরোনো রসিদ বা মেমো থাকা অত্যন্ত জরুরি। মেমো না থাকলে কেনা দাম প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে এবং অতিরিক্ত কর গুনতে হতে পারে। তাই সকল স্বর্ণের মেমো যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: জুয়েলারি বা অলংকারের দোকানে স্বর্ণ বিক্রি করার সময় কি কোনো ট্যাক্স কেটে রাখা হবে?
হ্যাঁ। জুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা যখন কোনো বিক্রেতার কাছ থেকে স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক বা প্লাটিনাম ক্রয় করবেন, তখন বিক্রেতার প্রাপ্য মোট মূল্যের ওপর ০.৫% (শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ) হারে উৎসে কর (TDS) কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন।
প্রশ্ন: স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে হওয়া লাভের ওপর করের হার (Tax Rate) কত নির্ধারণ করা হয়েছে?
ব্যবসায়িক পণ্য নয় এমন ব্যক্তিগত স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন ও মূল্যবান ধাতু বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনী আয়ের ওপর ফ্ল্যাট মাত্র ৫% (পাঁচ শতাংশ) কর প্রযোজ্য হবে।
প্রশ্ন: স্বর্ণ বিক্রির করের ক্ষেত্রে কেনার মেমো বা রসিদ রাখা কেন অত্যন্ত জরুরি?
মূলধনী কর হিসাব করা হয় স্বর্ণ বিক্রির মোট মূল্য থেকে তার প্রকৃত ক্রয়মূল্য (Cost of Acquisition) বাদ দিয়ে। যদি আপনার কাছে স্বর্ণটি পূর্বে কেনার আসল মেমো বা রসিদ না থাকে, তবে ক্রয়ের খরচ প্রমাণ করা কঠিন হবে এবং কর কর্মকর্তা ক্রয়মূল্য শূন্য ধরে আপনার সম্পূর্ণ বিক্রয়মূল্যের ওপরই কর নির্ধারণ করতে পারেন। এছাড়া বিক্রির সময় দোকানদার যে ০.৫% উৎসে কর (TDS) কেটে রাখবেন, তার মেমো থাকলে তা আপনার চূড়ান্ত ৫% মূলধনী করদায়ের সাথে সমন্বয় করা যাবে।