আয়কর রিটার্ন দাখিলের নতুন সময়সীমা -Tax Day বাতিল, চালু হলো Year-Round Filing
করবর্ষ ২০২৬-২৭|আয়কর আইন|
১৭ জুলাই, ২০২৬

আয়কর রিটার্ন দাখিলের নতুন সময়সীমা -Tax Day বাতিল, চালু হলো Year-Round Filing

এক নজরেঃ
  1. Tax Day বাতিল — এখন সারা বছর রিটার্ন দাখিল করা যাবে।
  2. ১ জুলাই–৩০ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে ৫% Early-Bird Rebate (সর্বোচ্চ ৳২৫,০০০)।
  3. দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে বেশিরভাগ কর রেয়াত ও অব্যাহতি (ধারা ১৭৪ অনুযায়ী) হারাবেন।

বাংলাদেশে আয়কর ব্যবস্থাপনায় (Income Tax Management) করদাতাদের জন্য একটি যুগান্তকারী সংস্কার এসেছে। অর্থ আইন ২০২৬-এর সংশোধনীতে "ট্যাক্স ডে" নামের পুরনো কনসেপ্ট সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এর জায়গায় ধারা ১৭০-এর অধীনে চালু হয়েছে Year-Round Return Filing ব্যবস্থা, যেখানে করদাতারা সারা বছর ধরে যেকোনো সময় রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

তবে করদাতারা (স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার) অর্থবছরের ঠিক কোন সময়ে তাদের রিটার্ন দাখিল করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে করদায়ে বিশেষ ছাড় (Incentive) অথবা অতিরিক্ত বিলম্ব করের সময়োপযোগী আইনি বিধান সংযোজিত হয়েছে। নিচে রিটার্ন দাখিলের সংশোধিত সময়সূচি, জরিমানার হার এবং বিশেষ আইনি বিষয়গুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলোঃ

  1. ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর — আগাম রিটার্ন দাখিলে ৫% বিশেষ কর ছাড় (Early-Bird Rebate): যারা বছরের শুরুতেই সুশৃঙ্খলভাবে রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা রাখা হয়েছে। এই ৩ মাসের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতা তার নিয়মিত প্রদেয় করের ওপর সরাসরি ৫% কর ছাড় বা প্রণোদনা পাবেন (যার সর্বোচ্চ আইনি সীমা ২৫,০০০ টাকা)।
  2. ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর — নিয়মিত ও স্বাভাবিক সময়সীমা: এই সময়কালকে রিটার্ন দাখিলের সাধারণ বা নিয়মিত সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই সময়ে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত কোনো জরিমানা বা বিলম্ব কর দিতে হবে না, তবে আগাম জমা দেওয়ার কোনো বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যাবে না।
  3. ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ — প্রথম ধাপের বিলম্ব কর: ৩১ ডিসেম্বরের নিয়মিত সময় পার হওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করলে তা "বিলম্বে রিটার্ন" (Late Return) হিসেবে গণ্য হবে। এই ৩ মাসের মধ্যে বিলম্ব রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ২% অতিরিক্ত কর অথবা ফ্ল্যাট ৩,০০০ টাকা (এই দুইটির মধ্যে যেটি বেশি) বিলম্ব কর বা জরিমানা হিসেবে প্রদেয় হবে।
  4. ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন — দ্বিতীয় ধাপের বিলম্ব কর: বিলম্বের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে, অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ ৩ মাসের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা হলে জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এই সময়ে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রদেয় করের ওপর সরাসরি ৫% অতিরিক্ত বিলম্ব কর অথবা ৫,০০০ টাকা (এই দুইটির মধ্যে যেটি বেশি) পরিশোধ করতে হবে।

বিশেষ শ্রেণীর করদাতাদের জন্য রিটার্ন জমার সময়সীমায় ব্যতিক্রমঃ

করদাতাদের করজালে অভ্যস্ত করতে এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স ও অবদানকে সম্মান জানাতে আইনের নতুন সংশোধনীতে বিশেষ দুটি শ্রেণীকে বিলম্ব জরিমানার সাধারণ নিয়ম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হয়েছে। এর ফলে তারা দেশে ফিরে বা প্রথম বছরের জন্য কোনো বাড়তি মানসিক চাপ ছাড়াই কর ফাইল গোছানোর পর্যাপ্ত অবকাশ পাবেন।

  1. প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারী করদাতা (First-time Filer): যেসকল স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা জীবনে প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিলম্ব করের সাধারণ নিয়মটি প্রযোজ্য হবে না। তারা কোনো অতিরিক্ত জরিমানা বা বিলম্ব কর ছাড়াই আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত বছরের যেকোনো দিন তাদের প্রথম রিটার্নটি দাখিল করার অনন্য আইনি সুবিধা পাবেন।
  2. বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী প্রবাসী করদাতা: উচ্চশিক্ষা, লিয়েনে চাকরি বা বাৎসরিক মেয়াদে বৈধ ভিসায় দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশী করদাতাদের স্বস্তি দিতে বিশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বাংলাদেশে পুনরায় প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে পরবর্তী ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে কোনো প্রকার বিলম্ব কর বা জরিমানা ছাড়াই নিরাপদে তাদের বার্ষিক রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন করতে পারবেন।

২০২৬-২০২৭ করবর্ষের করমুক্ত আয়সীমা এবং করহার জানুন

প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের জন্য নির্ধারিত রিটার্ন দাখিলের সময়সীমাঃ

কোম্পানি, অংশীদারি ফার্ম ও ব্যক্তিসংঘের জন্য ভিন্ন আইনি বাধ্যবাধকতা স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের মতো সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সাধারণ বা নমনীয় বিধানটি কোম্পানি ও অংশীদারি ফার্মের মতো প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ব্যবসার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করতে আইনের সংশোধনীতে তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করা হয়েছে।

বাধ্যতামূলক সময়সীমা: আইনের নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা ব্যতীত অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের (যেমন লিমিটেড কোম্পানি বা ব্যক্তিসংঘ) জন্য রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা হবে—সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী নবম মাসের ১৫তম দিন অথবা যেক্ষেত্রে উক্ত ১৫তম দিনটি ১৫ সেপ্টেম্বরের পূর্বের তারিখে পড়ে, সেক্ষেত্রে আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখের মধ্যে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের আইনি ক্ষতিঃ

অর্থ আইন, ২০২৬-এর অন্যতম কঠোর একটি সংস্কার হলো বিলম্ব রিটার্নের ক্ষেত্রে করদাতার কর অব্যাহতির সুযোগ অত্যন্ত সংকুচিত করা। আপনি যদি কোনো কারণে ৩১ ডিসেম্বরের নিয়মিত সময়সীমা পার হওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করেন, তবে জরিমানার পাশাপাশি আপনার বাৎসরিক আয়ের ওপর প্রদেয় করের হিসাব বদলে যাবে। আইনের সংশোধিত ধারা ১৭৪ অনুযায়ী, কোনো করদাতা যদি বিলম্ব রিটার্ন (Late Return) দাখিল করেন, তবে তিনি তাঁর নিয়মিত কর রেয়াত (Tax Rebate) এবং ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী প্রাপ্ত অধিকাংশ খাতের কর অব্যাহতির (Tax Exemption) আইনি অধিকার সম্পূর্ণরূপে হারাবেন। আইনি ব্যতিক্রম: বিলম্ব রিটার্ন দিলেও করদাতার অধিকার সুরক্ষায় শুধুমাত্র চাকরি বা চাকরি খাতের বেতন থেকে আয়, পেনশন, প্রাইজবন্ড বা লটারির পুরস্কার, বৈধ রিমিট্যান্স, সঞ্চয়পত্রের সুদ এবং উপহার বা দান থেকে প্রাপ্ত আয়ের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি বা হ্রাসকৃত করের আইনি সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকবে। তবে অন্যান্য সকল খাতের আয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত সাধারণ উচ্চ হারেই কর পরিগণনা করা হবে, যা করদাতার সামগ্রিক করদায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থাপনায় যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তা আধুনিক ও করদাতাবান্ধব বলা যায়। করদাতার জন্য কোনো অনমনীয় নির্দিষ্ট শেষ তারিখ বা "কর দিবস / Tax Day" আরোপ না করে সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া নিশ্চিতভাবেই করদাতাদের মানসিক চাপ দূর করতে সহায়তা করবে। তবে সারা বছর রিটার্ন দেওয়ার স্বাধীনতা থাকলেও বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কর রেয়াত এবং ষষ্ঠ তফিসলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর অব্যাহতিগুলো বাতিলের যে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, তা করদাতাদের সময়মতো ফাইল জমার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়।

একই সাথে, আর্লি বার্ড রেয়াতের মতো কর ছাড়ের প্রণোদনা এবং করদাতাদের হয়রানি কমাতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (EFT) মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত (Automated Refund) প্রবর্তন করা কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতারই বহিঃপ্রকাশ। তাই নতুন কর আইনের এই ইতিবাচক সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রথম কোয়ার্টার অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কর ফাইল প্রস্তুত করে তা দাখিল করাই হবে একজন সচেতন ও দূরদর্শী করদাতার জন্য সর্বোত্তম আইনি ও আর্থিক সিদ্ধান্ত।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: আয়কর রিটার্ন দাখিলের এখন কি কোনো নির্দিষ্ট "ট্যাক্স ডে" আছে?

উত্তর:

না, অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী ট্যাক্স ডে বাতিল করে সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ (Year-Round Filing) চালু করা হয়েছে।

প্রশ্ন: Early-Bird Rebate পেতে কবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে?

উত্তর:

১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাখিল করলে প্রদেয় করের ওপর ৫% রেয়াত পাওয়া যাবে, সর্বোচ্চ ৳২৫,০০০ পর্যন্ত।

প্রশ্ন: বিলম্বে রিটার্ন দিলে আমি কী কী সুবিধা হারাবো?

উত্তর:

নিয়মিত কর রেয়াত এবং ষষ্ঠ তফসিলের অধিকাংশ কর অব্যাহতি হারাবেন — শুধু বেতন, পেনশন, রেমিট্যান্স ও সঞ্চয়পত্রের আয়ে অব্যাহতি বহাল থাকবে।

প্রশ্ন: আমি জীবনে প্রথমবার রিটার্ন দিচ্ছি — আমার জন্য কি আলাদা সুবিধা আছে?

উত্তর:

হ্যাঁ, প্রথমবার ফাইলারদের জন্য কোনো বিলম্ব কর প্রযোজ্য নয়; আয়বর্ষ শেষের পরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় পাবেন।

প্রশ্ন: আমি প্রবাসী — দেশে ফেরার পর কতদিনের মধ্যে রিটার্ন দিতে হবে?

উত্তর:

দেশে ফেরার দিন থেকে ৯০ দিনের মধ্যে বিনা জরিমানায় রিটার্ন দাখিল করা যাবে।

এই আর্টিকেলে উল্লেখিত তথ্যাদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে সংসদে পাসকৃত চূড়ান্ত গেজেটভুক্ত 'অর্থ আইন, ২০২৬'-এর ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। কর সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপন যাচাই করে নেওয়া অথবা একজন সার্টিফাইড আয়কর আইনজীবীর সরাসরি পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।

মাহমুদুল হাসান বিজয়

আয়কর আইনজীবী

Mahmudul Hasan Bijoy — NBR Registered Income Tax Lawyer

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর তালিকাভুক্ত একজন আইনজীবী হিসেবে আমার কার্যক্ষেত্র কেবল রিটার্ন দাখিলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আয়কর অডিট মামলা নিষ্পত্তি, আয়ের উৎসের আইনি ব্যাখ্যা, সঠিক নথিপত্র প্রস্তুতকরণ এবং ট্রাইব্যুনাল বা আপিল শুনানিতে ক্লায়েন্টদের পক্ষে আইনি প্রতিনিধিত্ব করাই আমার পেশাগত দায়িত্ব।

সম্পর্কিত বিষয়

কর সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

জটিল কর আইন এবং অডিট ঝামেলা নিষ্পত্তিতে অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করতে পারেন।

চেম্বারের ঠিকানা

মাহমুদুল হাসান বিজয়

চেম্বার

১৪ কাকরাইল, রমনা, ঢাকা।

গুগল ম্যাপে দেখুন

সাক্ষাতের সময়

রবিবার - বৃহস্পতিবার:

সকাল ১০:০০ - বিকাল ৫:০০

শুক্রবার ও শনিবার: বন্ধ

সরাসরি যোগাযোগ

01951252375
"চেম্বারে সাক্ষাতের জন্য অনুগ্রহ করে ফোনে সময় নির্ধারণ করে নিন। পরামর্শের জন্য প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সাথে আনা আবশ্যক।"