করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও আয়কর বাড়ছে কেন? | Tax Rebate Bangladesh 2026-27
করবর্ষ ২০২৬-২৭|অর্থ আইন ২৬|আপডেট|
২ জুলাই, ২০২৬

করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও আয়কর বাড়ছে কেন? | Tax Rebate Bangladesh 2026-27

এক নজরেঃ

নতুন অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী কর রেয়াত:

  1. মোট করযোগ্য আয়ের ৩% অথবা,
  2. মোট বিনিয়োগের ১০% অথবা,
  3. সর্বোচ্চ আইনি সীমা ৭.৫০ লাখ টাকা - তিনটির মধ্যে যেটি কম।

(৩০শে জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত অর্থ আইন ২০২৬ অনুসারে)

বাজেটের খবর শোনার পর আমাদের অনেকেরই মনে হয়েছিল—যাক, করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বেড়ে ৪ লাখ টাকা (অর্থ আইন, ২০২৬ - ৩০ জুন, ২০২৬ অনুযায়ী) হওয়ায় এবার হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হিসাবের খাতা মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।

বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় হয়তো আমাদের পকেট থেকে আগের চেয়ে একটু বেশিই আয়কর চলে যেতে পারে। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও, নতুন আইনের কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তনের কারণেই মূলত এমনটা ঘটছে।

ধরে নিই, জনাব শাহীন একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, যাঁর বার্ষিক আয় ২৫ লাখ টাকা। নতুন ট্যাক্স স্ল্যাব অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা ৩.৫০ লাখ থেকে বেড়ে ৪ লাখ টাকা হওয়ায় তিনি ভাবছেন, এবার হয়তো তাঁর ট্যাক্স কিছুটা কমবে। কিন্তু একজন আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।

  1. আগে তিনি ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ১৫% হারে ৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত পেতেন।
  2. কিন্তু এখন চূড়ান্ত অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী রেয়াতের হার এক ধাক্কায় ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে। ফলে এখন তিনি রেয়াত পাবেন মাত্র ৫০,০০০ টাকা।

ফলাফল কী দাঁড়াল? করমুক্ত আয়ের প্রাথমিক সীমা ৫০,০০০ টাকা বাড়ার কারণে তিনি যে সামান্য সুবিধা পেয়েছিলেন, রেয়াতের হার কমার কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা তিনি হারিয়েছেন। হিসাব শেষে দেখা গেল, আয় ও বিনিয়োগ সমান থাকার পরও নতুন আইনি কাঠামোর কারণে জনাব শাহীনকে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩২,৫০০ টাকা অতিরিক্ত আয়কর গুনতে হচ্ছে।

আইনি ধাক্কাটি কোথায়?

আইনের আসল চাপটি লুকিয়ে আছে 'বিনিয়োগ রেয়াত' বা Tax Rebate-এর নতুন কাঠামোতে। নতুন অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী রেয়াত পাওয়ার তিনটি সীমার মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম, আপনি সেটাই ছাড় হিসেবে পাবেন:

  1. মোট করযোগ্য আয়ের ৩%
  2. মোট বিনিয়োগের ১০% (আগে ছিল ১৫%)
  3. সর্বোচ্চ আইনি সীমা ৭.৫০ লাখ টাকা (আগে ছিল ১০ লাখ)

এর মানে হলো, আয় বাড়লেও আপনার কর বাঁচানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। তাই অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সঠিক কর পরিকল্পনা করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।

তাহলে আইনিভাবে কর কমানোর উপায় কী?

একজন আয়কর আইনজীবী হিসেবে আমার পরামর্শ হলো — এখন আর গতানুগতিক শুধু সঞ্চয়পত্রে টাকা ফেলে রাখলে চলবে না। আপনার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওকে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে বৈচিত্র্যময় করতে হবে।

  1. স্মার্ট বিনিয়োগ বণ্টনঃ সব টাকা এক খাতে না রেখে আইনের সীমা অনুযায়ী ভাগ করে বিনিয়োগ করুন। তফসিলি ব্যাংকে DPS-এ বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার, সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ এবং সরকারি ট্রেজারি বন্ডে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে আইনি সুবিধা নিতে পারেন। সেই সাথে জীবন বীমার প্রিমিয়াম এবং সার্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রদত্ত চাঁদাও দারুণ কর-সাশ্রয়ী হাতিয়ার।
  2. অনুদানকে 'ট্যাক্স শিল্ড' হিসেবে ব্যবহারঃ আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট খাতে দান করলে কর রেয়াতের সুবিধা পাওয়া যায়। সরকারি যাকাত তহবিল, আইসিডিডিআরবি, সিআরপি, ব্র্যাক, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর বা ঢাকা আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে অনুদান আপনার করের বোঝাকে আইনিভাবে কমিয়ে আনবে। প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান, থ্যালাসেমিয়া সমিতি বা অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনে দান করেও করছাড় পাওয়া সম্ভব।
  3. সারচার্জ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনাঃ যাদের নিট সম্পদ ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, তাদের নিট করের ওপর ১০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত অতিরিক্ত সারচার্জ দিতে হবে। তাই বছর শেষে তাড়াহুড়ো না করে এখন থেকেই আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে সম্পদ পরিকল্পনা করে সারচার্জের চাপ থেকে বৈধভাবে মুক্ত থাকা সম্ভব। সারচার্জের বিস্তারিত হিসাব ও নিয়ম জানা থাকলে অডিটের ঝুঁকিও কমে।

আয়করের হিসাব এখন আর কেবল ক্যালকুলেটরের সাধারণ যোগ-বিয়োগ নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি আইনি কৌশল। একটু ভুল হিসাব বা পুরোনো ধারার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কারণে আপনি না জেনেই হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত কর দিয়ে ফেলবেন।

আপনার ব্যক্তিগত আয়, সম্পদ ও পেশার ওপর ভিত্তি করে কীভাবে Legal Tax Planning করলে সর্বোচ্চ আইনি সুবিধা পাবেন, তা জানতে একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: ২০২৬-২৭ করবর্ষে কর রেয়াতের হার কত?

উত্তর:

নতুন নিয়মে মোট করযোগ্য আয়ের ৩% অথবা বিনিয়োগের ওপর ১০% অথবা সর্বোচ্চ সীমা ৭.৫ লাখ টাকা হয়েছে

প্রশ্ন: আয়কর রেয়াত (Tax Rebate) পাওয়ার জন্য অনুমোদিত বিনিয়োগের প্রধান খাতগুলো কী কী?

উত্তর:

কর রেয়াত পাওয়ার জন্য আপনি সরকার অনুমোদিত বেশ কিছু খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  1. যেকোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডিপোজিট পেনশন স্কিমে (DPS) বিনিয়োগ।
  2. সঞ্চয়পত্র ক্রয়।
  3. যেকোনো সিকিউরিটিজ ক্রয় এবং বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত যেকোনো সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ।
  4. জীবন বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ।
  5. সর্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রদেয় চাঁদা।
  6. সরকারি, স্বীকৃত ও কল্যাণ তহবিলে বা সুপার এনুয়েশন ফান্ডে প্রদেয় চাঁদা।

প্রশ্ন: সঞ্চয়পত্র এবং ডিপিএস (DPS)-এ বিনিয়োগের কি কোনো নির্দিষ্ট সীমা আছে?

উত্তর:

হ্যাঁ। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কর রেয়াত পাওয়ার জন্য আপনি যেকোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপিএস (DPS)-এ বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ দেখাতে পারবেন। এছাড়া, সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা এবং যেকোনো সিকিউরিটিজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ কর রেয়াতের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

প্রশ্ন: শেয়ার বাজার বা সার্বজনীন পেনশন স্কিমে বিনিয়োগ করলে কি রেয়াত পাওয়া যাবে?

উত্তর:

অবশ্যই। বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত যেকোনো সিকিউরিটিজে (শেয়ার) বিনিয়োগ করলে আপনি কর রেয়াত পাবেন। একইসাথে, সরকার নতুন চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আপনার জমা করা চাঁদার ওপরও কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রেখেছে।

প্রশ্ন: কোন কোন প্রতিষ্ঠানে দান (Donation) করলে আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়?

উত্তর:

আপনি যদি নির্দিষ্ট কিছু সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে দান করেন, তবে সেই দানের অঙ্কটি আপনার মোট বিনিয়োগের অংশ হিসেবে গণ্য হবে এবং আপনি কর রেয়াত পাবেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি খাত হলো:

  1. সরকারি যাকাত তহবিল এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) অনুমোদিত যেকোনো দাতব্য হাসপাতাল।
  2. প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান।
  3. মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের কোনো প্রতিষ্ঠান।
  4. আইসিডিডিআরবি (ICDDRB), সিআরপি (CRP), ব্র্যাক (BRAC) এবং এশিয়াটিক সোসাইটি।
  5. ঢাকা আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ট্রাস্ট (BANCAT), এবং চাইল্ডহুড ক্যান্সার ফাউন্ডেশন (ASHIC)।
  6. শেরপুর ও মাওনা ডায়াবেটিক সমিতি, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি এবং অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।
  7. আল-মারকাজুল ইসলামী, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল।

প্রশ্ন: করমুক্ত সীমা বাড়লে কর কমার কথা, বাড়ছে কেন?

উত্তর:

করমুক্ত সীমা ৪,০০,০০০ টাকা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রেয়াত কমেছে (১৫% থেকে ১০%) এবং স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের কারণে Gross Tax অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। দুটো মিলিয়ে মধ্যম ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের নেট কর আলটিমেটলি বেড়ে গেছে।

প্রশ্ন: Legal Tax Planning কি সম্পূর্ণ বৈধ?

উত্তর:

হ্যাঁ। আয়কর আইনের ভেতরে থেকে বিনিয়োগ, অনুদান ও সম্পদ পরিকল্পনার মাধ্যমে কর কমানো সম্পূর্ণ বৈধ — এটি কর ফাঁকি নয়, বরং আইনি সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার।

প্রশ্ন: অগ্রিম কর পরিশোধ না করলে কি সমস্যা হবে?

উত্তর:

হ্যাঁ। নির্ধারিত সময়ে অগ্রিম কর না দিলে বার্ষিক ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত সুদ এবং 'খেলাপি করদাতা' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিস্তারিত জানতে পড়ুন অগ্রিম আয়করের শেষ কিস্তি ও জরিমানার নিয়ম

প্রশ্ন: বছর শেষে হিসাব করে যদি দেখি আমার আয়ের চেয়ে উৎসে কর (TDS) বেশি কাটা হয়ে গেছে, তাহলে কি সেই টাকা ফেরত পাব?

উত্তর:

হ্যাঁ! নতুন আইনের এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। আপনার প্রকৃত করদায়ের চেয়ে অতিরিক্ত উৎসে কর কাটা হলে, তা এখন সম্পূর্ণ রিফান্ডযোগ্য (Refundable)। আপনি চাইলে তা ফেরত নিতে পারবেন অথবা আগামী বছরের করের সাথে সমন্বয় করতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে ২০২৬-২০২৭ বাজেটে আয়করের মূল পরিবর্তনগুলো ফলো করুন

এই ব্লগে প্রকাশিত তথ্য সাধারণ পাঠকদের সচেতনতার উদ্দেশ্যে এবং ৩০ জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত 'অর্থ আইন, ২০২৬'-এর চূড়ান্ত গেজেটের ভিত্তিতে তৈরি। তবে কর সংক্রান্ত যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকারের সর্বশেষ গেজেট যাচাই করুন অথবা একজন নিবন্ধিত আয়কর আইনজীবীর সরাসরি পরামর্শ নিন।

মাহমুদুল হাসান বিজয়

আয়কর আইনজীবী

Mahmudul Hasan Bijoy — NBR Registered Income Tax Lawyer

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর তালিকাভুক্ত একজন আইনজীবী হিসেবে আমার কার্যক্ষেত্র কেবল রিটার্ন দাখিলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আয়কর অডিট মামলা নিষ্পত্তি, আয়ের উৎসের আইনি ব্যাখ্যা, সঠিক নথিপত্র প্রস্তুতকরণ এবং ট্রাইব্যুনাল বা আপিল শুনানিতে ক্লায়েন্টদের পক্ষে আইনি প্রতিনিধিত্ব করাই আমার পেশাগত দায়িত্ব।

সম্পর্কিত বিষয়

কর সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

জটিল কর আইন এবং অডিট ঝামেলা নিষ্পত্তিতে অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করতে পারেন।

চেম্বারের ঠিকানা

মাহমুদুল হাসান বিজয়

চেম্বার

১৪ কাকরাইল, রমনা, ঢাকা।

গুগল ম্যাপে দেখুন

সাক্ষাতের সময়

রবিবার - বৃহস্পতিবার:

সকাল ১০:০০ - বিকাল ৫:০০

শুক্রবার ও শনিবার: বন্ধ

সরাসরি যোগাযোগ

01951252375
"চেম্বারে সাক্ষাতের জন্য অনুগ্রহ করে ফোনে সময় নির্ধারণ করে নিন। পরামর্শের জন্য প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সাথে আনা আবশ্যক।"