
বাড়ি ভাড়ার আয়কর নিয়ম ও জামানতের ওপর কর
- ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি জামানতের ৩০ জুনের ব্যালেন্সের ১০% এখন "বিশেষ ভাড়া আয়" হিসেবে করযোগ্য।
- অফেরতযোগ্য সেলামির সবটুকু এক বছরে না দেখিয়ে চুক্তির মেয়াদ বা সর্বোচ্চ ৫ বছরে ইচ্ছেমতো বণ্টন করে কর দেওয়া যায়।
- মেরামত খরচ ছাড়: বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে ৩০%, আবাসিকে ২৫%।
আমাদের সমাজে ঘর, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া দেওয়ার সময় ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা বা সিকিউরিটি ডিপোজিট নেওয়া একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা। তবে নতুন কর আইনের অধীনে বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে কর নিরূপণের নিয়মে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে — এবং এটি ২০২৬-২৭ করবর্ষের সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনি যদি কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে থাকেন বা ভবিষ্যতে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে বার্ষিক রিটার্নে ট্যাক্সের হিসাব সঠিকভাবে মেলাতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে এই নিয়মগুলো জেনে রাখা জরুরি।
(বিশেষ ভাড়া আয়) ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি জামানতের ওপর করঃ
সাধারণত ভাড়াটিয়া ঘর বা দোকান ছেড়ে চলে গেলে তাঁর অগ্রিম বা সিকিউরিটি ডিপোজিট ফেরত দেওয়া হয়। পূর্বে বাড়িওয়ালাদের এই ফেরতযোগ্য জামানতের ওপর কোনো কর দিতে হতো না।
তবে পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অর্থবছর শেষে (৩০ জুন তারিখে) বাড়িওয়ালার হাতে জমা থাকা সিকিউরিটি ডিপোজিটের যে অংশ থাকবে, তার সরাসরি ১০% অর্থ "বিশেষ ভাড়া আয়" (Special Rent Income) হিসেবে করযোগ্য আয়ের সাথে যুক্ত হবে। প্রতি বছর ৩০শে জুনের অবশিষ্টাংশের ওপর এই হার প্রযোজ্য।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা ফেরতযোগ্য জামানত নিয়েছেন এবং ৩০শে জুনেও পুরো টাকা আপনার কাছেই আছে। এই ৫ লক্ষ টাকার ১০% অর্থাৎ ৫০,০০০ টাকা আপনার করযোগ্য আয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে এবং নিয়মিত করের হার অনুযায়ী এর ওপর ট্যাক্স দিতে হবে।
অফেরতযোগ্য অগ্রিম বা সেলামি বণ্টন করার বিশেষ সুবিধাঃ
বাণিজ্যিক সম্পত্তি বা দোকান ভাড়া দেওয়ার সময় বাড়িওয়ালারা প্রায়ই এককালীন বড় অঙ্কের অফেরতযোগ্য টাকা নেন, যাকে কর আইনে "সেলামি বা প্রিমিয়াম" (Salami or Premium) বলা হয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই অফেরতযোগ্য সেলামি যে বছর গ্রহণ করবেন, সে বছরই তা "বিশেষ ভাড়া আয়" হিসেবে করযোগ্য হবে। তবে করদাতাকে একটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে — পুরো টাকা এক বছরে না দেখিয়ে, লিজ বা ভাড়ার মেয়াদ অথবা সর্বোচ্চ ৫ বছর (যেটি কম), সেই মেয়াদে ইচ্ছেমতো বণ্টন করে প্রতি বছর অল্প অল্প করে কর দেওয়া যায়।
যেমন, এককালীন ৫,০০,০০০ টাকা অফেরতযোগ্য সেলামি পেলেন, ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ ৭ বছর — যেহেতু ৫ বছর কম, তাই সর্বোচ্চ ৫ বছরে ভাগ করতে পারবেন। প্রতি বছর ১,০০,০০০ টাকা করে করযোগ্য আয়ের সাথে যোগ করে ট্যাক্স দিতে পারবেন, ফলে এক বছরেই বড় অঙ্কের ট্যাক্স দেওয়ার চাপ থেকে বাঁচবেন।
টাকা ফেরত দেওয়ার সুবিধা: চুক্তির মাঝপথে অফেরতযোগ্য অগ্রিমের কোনো অংশ ভাড়াটিয়াকে ফেরত দিলে, সেই বছরের ভাড়া আয় হিসাবের সময় ফেরত দেওয়া অংশ বাদ দিতে পারবেন।
নিয়মিত ভাড়া আয়ের ওপর মেরামতের খরচ বাবদ ছাড়ঃ
মোট ভাড়ামূল্যের ওপর সরাসরি হিসাব করে:
- বাণিজ্যিক সম্পত্তি (দোকান/অফিস) এর ক্ষেত্রে বাৎসরিক মোট ভাড়ার ৩০% মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।
- আবাসিক সম্পত্তি (থাকার ঘর/ফ্ল্যাট) এর ক্ষেত্রে বাৎসরিক মোট ভাড়ার ২৫% মেরামতের খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।

ভাড়া আদায়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাধ্যবাধকতাঃ
নতুন কর আইনে নগদে ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সম্পত্তি ভাড়ার বিপরীতে যেকোনো প্রাপ্তি অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফার বা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রহণ করা উচিত। ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়া ভাড়া গ্রহণ করলে তিনটি সমস্যা হবে:
- অগ্রিমের কিস্তি সুবিধা বাতিল: ৫ লক্ষ টাকার বেশি অগ্রিম নগদে নিলে তা সরাসরি ওই বছরের "বিশেষ ভাড়া আয়" হিসেবে গণ্য হবে এবং বণ্টন/কিস্তির সুবিধা পাওয়া যাবে না।
- TDS ৫০% বৃদ্ধি: আইন অনুযায়ী নিয়মিত ৫% উৎসে করের জায়গায় ৭.৫% উৎসে কর কর্তন হবে।
- ভাড়াটিয়ার খরচ বাতিল: প্রাতিষ্ঠানিক/কর্পোরেট ভাড়াটিয়া ক্যাশে ভাড়া দিলে তা তাদের কর ফাইলে ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে দাবি করতে পারবে না।
পুরো বিষয়টি আরও সহজে বোঝার জন্য আসুন আমরা একজন সাধারণ বাড়িওয়ালা জনাব আরিফের ভাড়া খাতের করযোগ্য আয়ের হিসাবটি ধাপে ধাপে দেখে নিই। তিনি গুলশানে তাঁর একটি বাণিজ্যিক স্পেস মাসিক ৫০,০০০ টাকায় ভাড়া দিয়েছেন। চুক্তির সময় তিনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানত নিয়েছেন এবং এককালীন ৩,০০,০০০ টাকা অফেরতযোগ্য সেলামি গ্রহণ করেছেন (যা তিনি ৫ বছরের সমহারে কর বণ্টনের সুবিধা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন)।
চলুন দেখে নিই নতুন নিয়মে তাঁর ভাড়া খাতের মোট করযোগ্য আয় কত হবে:
- নিয়মিত ভাড়া খাতের আয় হিসাব বাৎসরিক মোট ভাড়া প্রাপ্তি (৫০,০০০ টাকা × ১২ মাস) = ৬,০০,০০০ টাকা।
- বাদ: বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য সংবিধিবদ্ধ মেরামত খরচ ছাড় (মোট ভাড়ার ৩০%): (১,৮০,০০০) টাকা।
- সুতরাং, নিয়মিত ভাড়া খাতের নিট আয় (ক) = (৬,২০,০০০ - ১,৮০,০০০) = ৪,২০,০০০ টাকা।
বিশেষ ভাড়া আয় নির্ণয়ঃ
- বিশেষ ভাড়া খাতের আয়ের হিসাব ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানতের ওপর বিশেষ আয় (৫,০০,০০০ টাকার ১০%) = ৫০,০০০ টাকা।
- অফেরতযোগ্য সেলামির বাৎসরিক কিস্তি (৩,০০,০০০ টাকা ÷ ৫ বছর) = ৬০,০০০ টাকা।
- সুতরাং, মোট বিশেষ ভাড়া খাতের আয় (খ) = (৫০,০০০ + ৬০,০০০) = ১,১০,০০০ টাকা।
জনাব আরিফের মোট করযোগ্য ভাড়া খাতের আয় (ক + খ) = (৪,২০,০০০ + ১,১০,০০০) = ৫,৩০,০০০ টাকা।
অর্থাৎ, আগে জনাব আরিফের করযোগ্য ভাড়া খাতের আয় হতো কেবল ৪,২০,০০০ টাকা। কিন্তু নতুন আইনের কারণে ফেরতযোগ্য জামানত ও সেলামি নেওয়ার ফলে তাঁর করযোগ্য আয়ের সাথে অতিরিক্ত ১,১০,০০০ টাকা যুক্ত হয়ে নিয়মিত হারে কর পরিশোধ করতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি জামানতের ওপর কি কর দিতে হয়?
হ্যাঁ, ৩০ জুন তারিখে বাড়িওয়ালার কাছে জমা থাকা ফেরতযোগ্য জামানতের ১০% "বিশেষ ভাড়া আয়" হিসেবে করযোগ্য।
প্রশ্ন: অফেরতযোগ্য সেলামি এক বছরে না দেখিয়ে ভাগ করে দেখানো যায় কি?
হ্যাঁ, চুক্তির মেয়াদ বা সর্বোচ্চ ৫ বছর (যেটি কম) — সেই মেয়াদে ইচ্ছেমতো বণ্টন করে প্রতি বছর কর দেওয়া যায়।
প্রশ্ন: ভাড়ার মেরামত খরচ বাবদ কত ছাড় পাওয়া যায়?
বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে মোট ভাড়ার ৩০% এবং আবাসিক সম্পত্তিতে ২৫% মেরামত খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যায়।