আইনি ব্লগ ও কর আপডেট
বাংলাদেশে আয়কর আইন, ই-রিটার্ন দাখিল, টিআইএন নিবন্ধন এবং কর বিষয়ক আলোচনা। সর্বশেষ এনবিআর নির্দেশিকা এবং কর আইন বিশ্লেষণ সম্পর্কে আপডেট থাকুন।

চাকরিজীবীদের আয়কর গাইড | করমুক্ত সীমা ও নিয়ম
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও সাধারণ বেতনভোগী করদাতাদের জন্য বছর শেষে আয়ের হিসাব মেলানো এবং সঠিক সময়ে রিটার্ন দাখিল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি দায়িত্ব। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে পকেটের আয়ের কতটা অংশ করের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর কতটা অংশ সঞ্চয় হিসেবে নিজের কাছে রাখা যাবে—তা নিয়ে করদাতাদের চিন্তার অন্ত থাকে না। এই ২০২৬-২৭ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা এবং করের হারগুলোতে যেমন বড় পরিবর্তন এসেছে, তেমনি চাকরিজীবীদের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কর পরিগণনার ক্ষেত্রেও এসেছে সুনির্দিষ্ট কিছু সংস্কার। চাকরি খাতের মোট করযোগ্য আয় নির্ধারণের জটিল হিসাব এবং সম্পূর্ণ আইনি উপায়ে অনলাইনে কর রেয়াত দাবি করার সেরা কৌশলগুলো নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।১. সাধারণ ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত সীমা এবং করের স্ল্যাবসমূহঃশুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্টভাবে জেনে রাখা আবশ্যক যে, নতুন অর্থ আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা এবং করের স্ল্যাবগুলো কেবল চাকরিজীবীদের জন্য নয়, বরং দেশের সকল সাধারণ ব্যক্তি করদাতার (যেমন: ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, স্বাধীন পেশাজীবী ইত্যাদি) জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা বৃদ্ধি করে সরাসরি ৪,০০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে করদাতার বিশেষ শ্রেণী বা যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে (যেমন: নারী, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত করদাতা) এই সীমার ভিন্নতা রয়েছে। করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর আয়ের অতিরিক্ত অংশের ওপর ধাপে ধাপে ১০% থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০% পর্যন্ত করের হার কার্যকর হয়। দেশের সকল শ্রেণীর করদাতার জন্য প্রযোজ্য এই সাধারণ করমুক্ত সীমা এবং কোন স্ল্যাবে কত শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে, তা বিস্তারিত গাণিতিক উদাহরণসহ জানতে আমার এই ২০২৬-২৭ করবর্ষের নতুন করমুক্ত সীমা ও ট্যাক্স স্ল্যাব সম্পূর্ণ ব্লগটি পড়ে নিতে পারেন।২. চাকরি খাতের বিশেষ করছাড়ঃআয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী চাকরিজীবী করদাতাদের সুরক্ষায় একটি চমৎকার সাধারণ করছাড়ের বিধান রয়েছে। চাকরি হতে অর্জিত মোট বার্ষিক আয়ের (যার মধ্যে মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, বোনাস ইত্যাদি সব উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকে) একটি বড় অংশকে সরাসরি করমুক্ত রাখা হয়। আইন অনুযায়ী করযোগ্য চাকরি খাতের মোট আয়ের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) অথবা বাৎসরিক ৪,৫০,০০০ টাকা—এই দুইটির মধ্যে যেটি কম হবে, সেই পরিমাণ অর্থ সরাসরি মোট আয় থেকে করমুক্ত হিসেবে বাদ যাবে। এই বিশেষ ছাড়ে কিন্তু কোনো প্রকার সঞ্চয়পত্র বা ডিপিএস-এ বিনিয়োগ দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না, এটি সব চাকরিজীবীর জন্য আইনি অধিকার।৩. সরকারি বেতন আদেশভুক্ত বনাম বেসরকারি ও ব্যাংক কর্মকর্তাঃবেতনভোগীদের কর পরিগণনায় সবচেয়ে বড় বিভাজনটি ঘটে তাঁদের কর্মক্ষেত্রের ধরনের ওপর ভিত্তি করে: সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী: সরকারের মূল সিভিল সার্ভিস এবং বিশেষ কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের আয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রজ্ঞাপন (S.R.O. No. 225-Law/2023) প্রযোজ্য। এই নিয়মে তাঁদের সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সকল প্রকার ভাতা সম্পূর্ণ করমুক্ত। তাঁদের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র মূল বেতন (Basic Salary) এবং উৎসব বোনাস (Festival Bonus) করযোগ্য আয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এর ওপর নিয়মিত কর স্ল্যাব অনুযায়ী ট্যাক্স হিসাব করতে হবে।বেসরকারি ও তফসিলি ব্যাংক কর্মকর্তা: সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক বা অন্যান্য তফসিলি ব্যাংক স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত কর্পোরেশন হিসেবে কাজ করলেও এদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কমপ্লায়েন্সের সম্পূর্ণ সুবিধা পান না। বেসরকারি এবং এই ব্যাংক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, ইন্সেন্টিভ বা পারফরম্যান্স বোনাস এবং অন্যান্য সুবিধা সবই চাকরি খাতের আয়ের অংশ হিসেবে গণ্য হবে। অতঃপর এই মোট আয়ের ওপর ওই পূর্বোক্ত ১/৩ অংশ বা ৪.৫০ লক্ষ টাকা করমুক্তির নিয়ম প্রয়োগ করে করযোগ্য আয় বের করতে হবে। (নোট: চাকরিজীবনের পাশাপাশি করদাতার যদি নিজস্ব বাড়ি বা সম্পত্তি থাকে এবং সেখান থেকে বাড়ি ভাড়া বাবদ আয় অর্জিত হয়, তবে সাধারণ বেতনের পাশাপাশি তাঁর জন্য বাড়ি ভাড়ার আয়কর নিয়ম ও জামানতের ওপর করের বিধান অনুযায়ী ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি জামানতের ওপর বিশেষ কর পরিগণনা করতে হবে।)৪. বিনিয়োগ রেয়াতের মাধ্যমে প্রদেয় কর হ্রাস করার কৌশলঃচাকরিজীবীদের নিট করযোগ্য আয় নিরূপণের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করে প্রদেয় কর বা নিট ট্যাক্স সরাসরি কমিয়ে আনা। অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী সাধারণ বিনিয়োগের ওপর রেয়াতের হার ১৫% থেকে কমিয়ে সরাসরি ১০% করা হয়েছে। এখন একজন চাকরিজীবী তাঁর মোট করযোগ্য আয়ের ৩%, মোট বার্ষিক অনুমোদিত বিনিয়োগের ১০% অথবা সর্বোচ্চ আইনি সীমা ৭,৫০,০০০ টাকার মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম, সেটাই কর ছাড় হিসেবে পাবেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো অনুমোদিত প্রভিডেন্ট ফান্ড (Recognized Provident Fund) । এই ফান্ডে করদাতার নিজের করা চাঁদার ওপর তিনি সরাসরি বিনিয়োগ রেয়াত দাবি করতে পারবেন। এছাড়া পরবর্তীতে চাকরি শেষে অথবা একটানা ৫ বছর চাকরি করার পর এই ফান্ড থেকে উত্তোলিত সম্পূর্ণ মূল টাকা এবং তার ওপর অর্জিত সুদ সম্পূর্ণ করমুক্ত (Tax-free) থাকবে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের পাশাপাশি অনুমোদিত ডিপিএস (বাৎসরিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা), জীবন বীমার প্রিমিয়াম এবং সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে কীভাবে কর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসবেন, তার আইনি কৌশল জানতে পড়ুন বিনিয়োগ রেয়াতের নতুন কাঠামো ও কর রেয়াতের নিয়মাবলী।৫. সময়মতো অনলাইন ই-রিটার্ন দাখিল এবং জরিমানা এড়ানোর পরামর্শঃNBR এর সর্বশেষ নির্দেশিকা অনুযায়ী, দেশের সাধারণ করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের একমাত্র এবং সবচেয়ে আধুনিক মাধ্যম হলো অনলাইন ই-রিটার্ন বা e-Return পোর্টাল। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বছর শেষে নিয়োগকর্তা কর্তৃক কেটে রাখা উৎসে কর (TDS) এবং ব্যাংক জমার বিপরীতে কাটা করের সফল সমন্বয় নিশ্চিত করতে অনলাইন ফাইলিং সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম। সর্বোপরি, মনে রাখবেন যে নির্ধারিত সময়সীমার পরে রিটার্ন দাখিল করলে আপনি নিয়মিত কর রেয়াত এবং ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী প্রাপ্ত চাকরি খাতের অধিকাংশ কর অব্যাহতির আইনি অধিকার সম্পূর্ণরূপে হারাবেন। তাই জরিমানার হাত থেকে বাঁচতে এবং ৫% আর্লি-বার্ড কর ছাড়ের সুবিধা নিতে সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়া আবশ্যক। রিটার্ন জমার সর্বশেষ তারিখ এবং দেরিতে ফাইল জমার আইনি ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের এই রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা ও জরিমানা এড়ানোর উপায় গাইডটি দেখে নিন।পরিশেষে বলা যায়, কর প্রদান বা বাৎসরিক রিটার্ন দাখিল করা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক তথ্য পূরণ বা বাটন প্রেস করার বিষয় নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের নিকট আপনার কষ্টার্জিত আয়ের একটি স্থায়ী ও সংবেদনশীল আইনি ঘোষণা। অর্থ আইন, ২০২৬-এর অধীনে কর ব্যবস্থাকে যেভাবে কঠোর আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে, সেখানে প্রতিটি হিসাবের শতভাগ নির্ভুলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। চাকরি খাতের এক-তৃতীয়াংশ করছাড়ের পরিগণনা, প্রভিডেন্ট ফান্ডের করমুক্ত অংশ নির্ধারণ এবং আর্থিক সম্পদের উৎসে করের সফল সমন্বয়—প্রতিটি ধাপে আইনি সূক্ষ্মতা ও গভীরতার প্রয়োজন রয়েছে। বছর শেষে তাড়াহুড়ো করে আইনি ঝুঁকিতে পড়ার চেয়ে অর্থবছরের শুরু থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট কর পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অভিজ্ঞ প্রফেশনালের পরামর্শ গ্রহণ করা আপনার কষ্টার্জিত আয়ের সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

ব্যবসা ও পেশা খাতের কর ব্যবস্থা এবং টার্নওভার ট্যাক্সের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় ২০২৬ সালের নতুন অর্থ আইন এবং আয়কর আইনের সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা দেশের করদাতাদের ব্যবসায়িক ও পেশাগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এই বছরের আয়কর আইনের সবচেয়ে মৌলিক পরিবর্তনটি হলো—আয়কর আইনে ব্যবসা এবং পেশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়েছে। ইতিপূর্বে চিকিৎসকেরা চেম্বার থেকে, আইনজীবীরা ওকালতি থেকে কিংবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টরা ফার্ম থেকে যে আয় করতেন, তা প্রায়শই "অন্যান্য উৎসের আয়" বা পৃথক একটি অস্পষ্ট ক্যাটাগরিতে পরিগণনা করা হতো, যা নিয়ে করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তির শেষ ছিল না। নতুন আইনে এই সমস্ত স্বাধীন পেশাজীবী—যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, চার্টার্ড সেক্রেটারি, কনসালটেন্ট ইত্যাদি পেশাগত আয়কে সরাসরি "ব্যবসা ও পেশা হতে আয়" (Income from Business or Profession) খাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন পেশাজীবীদের জন্য কর পরিগণনার নিয়ম ও বৈধ খরচ বাদ দেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট ও সহজ হয়েছে, অন্যদিকে তাঁদের ওপর হিসাব রক্ষণ ও অডিট কমপ্লায়েন্সের আইনি বাধ্যবাধকতাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা ছাড়া অন্যান্য করদাতার বাৎসরিক টার্নওভার যদি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দ্বারা অডিট করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ব্যবসা বা পেশা থেকে আয় থাকলে নিজেদের চেম্বার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (PSR) ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম অমান্য করলে ন্যূনতম ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।অডিট ও আয় পরিগণনাপত্র দাখিলের নতুন নিয়মব্যবসায়ী বা স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে যারা এককভাবে অথবা অংশীদারি ফার্মের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তাঁদের জন্য অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে অডিটের নিয়মে একটি চমৎকার শৃঙ্খলা আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে আপনি যদি একক মালিকানাধীন বা প্রোপরাইটরশিপ ব্যবসা পরিচালনা করেন (যাঁরা স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা হিসেবে গণ্য), তবে আপনার বাৎসরিক টার্নওভার বা মূলধন যতই হোক না কেন, রিটার্নের সাথে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দ্বারা অডিটেড ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে, ব্যক্তি করদাতার যদি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে ব্যবসায়িক আয় অর্জিত হয়ে থাকে, কেবল তখনই অডিট রিপোর্টের প্রয়োজন পড়বে। অংশীদারি ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ এবং হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের (HUF) ক্ষেত্রে অডিটের নিয়মটি অনেক স্পষ্ট করা হয়েছে। নতুন নিয়মে এই শ্রেণীর করদাতাদের বাৎসরিক টার্নওভার যদি ১০ কোটি টাকা অতিক্রম করে অথবা ব্যবসায়িক মূলধন ৫ কোটি টাকার বেশি হয়, কেবল তখনই রিটার্নের সাথে ১. চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Chartered Accountant - CA) অথবা ২. কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (Cost and Management Accountant - CMA) অথবা ৩. আয়কর আইনজীবী (Income Tax Lawyer) দ্বারা নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এই সীমার নিচে থাকলে অংশীদারি ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘের জন্য অডিট রিপোর্টের প্রয়োজন পড়বে না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারটি হলো—অডিটের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, বাৎসরিক টার্নওভার বা মূলধন যতই কম হোক না কেন, দেশের প্রতিটি অংশীদারি ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের জন্য তাঁদের বাৎসরিক আয়কর রিটার্নের সাথে নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট অথবা অনুমোদিত আয়কর আইনজীবী দ্বারা প্রত্যয়িত সুনির্দিষ্ট "আয় পরিগণনাপত্র" (Income Computation Sheet) দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।ব্যবসায়ের অনুমোদনযোগ্য খরচ ও বিয়োজন নীতিঃব্যবসা বা পেশা খাতের প্রকৃত করযোগ্য নিট আয় নির্ধারণ করার জন্য করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন খরচগুলো তাঁরা আইনগতভাবে ব্যবসার আয় থেকে বাদ দিতে পারবেন। কাঁচামাল বা পণ্য ক্রয় সংক্রান্ত খরচ ব্যবসার প্রধান অনুমোদনযোগ্য খরচ, তবে কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে এককালীন ৫ লক্ষ টাকার বেশি নগদ বা ক্যাশ লেনদেন করা হলে তা ব্যবসার খরচ হিসেবে অননুমোদিত হবে এবং আইন অনুযায়ী তা বিশেষ ব্যবসায়িক আয় হিসেবে নিয়মিত হারে করযোগ্য হবে। ব্যবসা বা পেশার কার্যালয়, শোরুম বা ফ্যাক্টরির জন্য পরিশোধিত ভাড়ার সম্পূর্ণ খরচটি অনুমোদনযোগ্য হলেও তা অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় ভাড়ার সম্পূর্ণ খরচটি অননুমোদিত ব্যয় হিসেবে গণ্য হয়ে ব্যবসার আয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে।কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে তা অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।বিজ্ঞাপনের বাইরে নগদ বা উপহারের মাধ্যমে করা অন্যান্য প্রচারণামূলক বা প্রোমোশনাল খরচের সর্বোচ্চ সীমা অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে বাৎসরিক টার্নওভারের সরাসরি ১% করা হয়েছে, যা ব্যবসা প্রসারে করদাতাদের কর ছাড়ের সুযোগ অনেক বাড়িয়ে দেবে। আপ্যায়ন খরচের ক্ষেত্রেও পূর্বের ধাপে ধাপে জটিল হিসাব বাতিল করে অত্যন্ত সহজ নিয়ম করা হয়েছে, যার অধীনে আপ্যায়ন ব্যয় বিয়োজন ব্যতীত নিরূপিত আয়ের সর্বোচ্চ ৪% অথবা করদাতার দাবিকৃত প্রকৃত আপ্যায়ন খরচ, এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম হবে, সেই পরিমাণ ব্যবসার খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।এছাড়াও, ব্যবসা বা পেশা পরিচালনায় প্রাসঙ্গিক অন্যান্য নিয়মিত খরচগুলোকেও ব্যবসার বৈধ খরচ হিসেবে আয়কর আইন অনুযায়ী বিয়োজন করার স্পষ্ট আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই খরচগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—ব্যবসায়িক মালামাল বা সম্পদ সুরক্ষার জন্য পরিশোধিত বীমা প্রিমিয়াম এবং অফিস, আসবাবপত্র, চেম্বার বা ফ্যাক্টরি মেরামতের প্রকৃত ব্যয়। কার্যালয় বা কারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা ফুয়েল বিলের প্রকৃত পরিশোধিত অর্থ ব্যবসার খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য আয়োজিত পেশাগত প্রশিক্ষণ ব্যয়, ব্যবসার মালামাল সংগ্রহ বা সাধারণ যাতায়াতের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত যাতায়াত ও ভ্রমণ খরচ, এবং ব্যবসার নিয়মিত যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ইন্টারনেট, মোবাইল ও ডাক বা কুরিয়ার বিলের বাৎসরিক ব্যয়ের অর্থ ব্যবসার খরচ হিসেবে দাবি করা যাবে। হিসাব নিরীক্ষার জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টদের অডিট ফি, কর আইনজীবীদের প্রফেশনাল ফি, ব্যবসার যেকোনো আইনি লড়াইয়ের ব্যয়, এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে সংঘটিত প্রকৃত লোকসান ব্যবসার খরচ হিসেবে সমন্বয়যোগ্য। ব্যবসার বকেয়া পাওনার যে অংশটি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরও আদায় করা সম্ভব হয়নি এবং কুঋণ বা মন্দ ঋণ (Bad Debt) হিসেবে লিখে ফেলা হয়েছে, তা কর কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যবসার খরচ হিসেবে বিয়োজন করা যাবে। ব্যবসা বা পেশা পরিচালনার সুবিধার্থে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে নেওয়া ঋণের ওপর বাৎসরিক পরিশোধিত সুদ বা মুনাফার অর্থ এবং ব্যবসার জন্য কেনা আসবাবপত্র, দালানকোঠা বা ভারী যন্ত্রপাতির অবচয় বা অবলোপন ভাতা (Depreciation & Amortization) ব্যবসার অন্যতম প্রধান বাদযোগ্য খরচ হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাইশি এই সুনির্দিষ্ট খরচগুলোর বাইরেও যদি করদাতা প্রমাণ করতে পারেন যে কোনো নির্দিষ্ট খরচ সম্পূর্ণরূপে এবং শুধুমাত্র ব্যবসা বা পেশার স্বার্থেই করা হয়েছে, তবে কর কর্মকর্তা তা ব্যবসার সাধারণ ব্যয় হিসেবে অনুমোদন করবেন।খুচরা বিক্রেতা বা রিটেইল ব্যবসার জন্য পণ্য ক্রয়ে নতুন অগ্রিম করঃদেশের খুচরা ব্যবসা খাতকে আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে এবং করের জাল বিস্তৃত করতে অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে মূল আয়কর আইনে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী নতুন ধারা ১৩০ক (Section 130A) সংযোজন করা হয়েছে। এই নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো পণ্য উৎপাদক বা ম্যানুফ্যাকচারার, আমদানিকারক, পরিবেশক, সরবরাহকারী বা আড়তদার যখন কোনো খুচরা বিক্রেতার (Retailer) কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করবেন, তখন সেই বিক্রয় বা সরবরাহের বিপরীতে প্রস্তুতকৃত বিল বা চালানের মোট মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ০.২% (শূণ্য দশমিক দুই শতাংশ) হারে অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ বা কেটে রাখবেন।এই কেটে রাখা অগ্রিম করটি খুচরা বিক্রেতাদের জন্য কোনো চূড়ান্ত করদায় নয়, বরং এটি বছর শেষে তাঁদের নিয়মিত করদায়ের সাথে সমন্বয়ের যোগ্য। ধরা যাক, একজন খুচরা মুদি দোকানদার বা কাপড়ের রিটেইলার কোনো বড় পরিবেশক বা কোম্পানির কাছ থেকে বাৎসরিক মোট ৫০,০০,০০০ টাকার মালামাল স্টক করার জন্য ক্রয় করলেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মালামাল সরবরাহের সময় কোম্পানি উক্ত চালানের ওপর অতিরিক্ত ০.২% অর্থাৎ ১০,০০০ টাকা অগ্রিম কর হিসেবে সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। খুচরা বিক্রেতা বছর শেষে যখন তাঁর আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন, তখন তিনি এই ১০,০০০ টাকা অগ্রিম কর (Advance Tax) হিসেবে প্রদর্শন করে তাঁর মূল করদায় থেকে সরাসরি বাদ দিতে পারবেন। এর ফলে ছোট বড় সকল খুচরা বিক্রেতার ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য কর ফাইলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ রাখা সহজ হবে।টার্নওভার ট্যাক্স এবং এসএমই খাতের ওপর এর প্রভাবঃব্যবসায়ীদের কর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ হলো ধারা ১৬৩(৫) অনুযায়ী আরোপিত ন্যূনতম কর বা টার্নওভার কর। অর্থ আইন, ২০২৬-এ প্রাথমিকভাবে সাধারণ ব্যবসা ও লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবসায় লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে বাৎসরিক মোট গ্রস প্রাপ্তি বা টার্নওভারের ওপর ফ্ল্যাট ১% ন্যূনতম কর বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ী মহলের ব্যাপক আপত্তি ও FBCCI-এর আনুষ্ঠানিক দাবির প্রেক্ষিতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন (এসআরও নং ৩২৪-আইন/আয়কর-০৫/২০২৬) জারি করে ধারা ১৬৩(৬)-এর সারণিতে উল্লিখিত ১% টার্নওভার করের নিয়মটি বাতিল করেছে। এই সংশোধনীর ফলে এখন থেকে টার্নওভার কর আর ফ্ল্যাট হারে নয়, বরং ব্যবসার আকার অনুযায়ী তিনটি ধাপে (Tiered Structure) নির্ধারিত হবে।নতুন হার অনুযায়ীঃ বাৎসরিক গ্রস প্রাপ্তি বা টার্নওভার ২ (দুই) কোটি টাকা পর্যন্ত হলে — কোনো টার্নওভার ট্যাক্স প্রযোজ্য হবে না (০%) । বাৎসরিক টার্নওভার ২ কোটি টাকার অধিক তবে ৪ (চার) কোটি টাকার অধিক নয়, এমন ক্ষেত্রে — টার্নওভারের ০.৫০% হারে কর প্রযোজ্য হবে। বাৎসরিক টার্নওভার ৪ কোটি টাকার অধিক হলে — পূর্বের মতোই টার্নওভারের ১% হারে কর প্রযোজ্য হবে।এই সংশোধনী প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকেই অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। উল্লেখ্য, এই সাধারণ হারের বাইরে বিশেষ কিছু খাতের জন্য আলাদা হার এখনও বহাল রয়েছে — তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে এই করের হার ৩%, কার্বনেটেড বেভারেজ ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে ২.৫%, এবং মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনটিটিএন (NTTN) প্রতিষ্ঠানের জন্য ১.৫% প্রযোজ্য হবে। তবে উৎপাদনে নিয়োজিত নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর প্রথম ৩ বছরের জন্য এই করের হার হ্রাস করে মাত্র ০.২% করা হয়েছে; একই সাথে অর্থ আইনের বিশেষ প্রোভিসো বা শর্তানুযায়ী কোনো সরকারি সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশন কর্তৃক সার, বীজ অথবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানি, বিতরণ বা খোলা বাজারে বিক্রয়, কমিশন ব্যবসা, ডিও (Delivery Order) ব্যবসা, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা, এবং স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক বা প্ল্যাটিনাম ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসাকে এই টার্নওভার কর বা ন্যূনতম করের আওতা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপনে টার্নওভার কর কেমন হবে, একটু উদাহরণ দিয়ে দেখা যাক— উদাহরণ–১: কোনো ব্যবসায়ীর বার্ষিক টার্নওভার ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যেহেতু এটি ২ কোটি টাকার সীমার মধ্যেই আছে, তাই টার্নওভার কর হচ্ছে শূন্য টাকা। উদাহরণ–২: ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ীর টার্নওভার ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এটি ২ কোটির বেশি কিন্তু ৪ কোটির কম হওয়ায়, পুরো ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ওপর ০.৫০% হারে টার্নওভার কর হচ্ছে— ৩,৫০,০০,০০০ × ০.৫০% = ১,৭৫,০০০ টাকা। লক্ষণীয়, শুধু ২ কোটির অতিরিক্ত অংশের ওপর নয়—পুরো অঙ্কের ওপরই এই হার প্রযোজ্য। উদাহরণ–৩: এবার ধরুন, টার্নওভার ৬ কোটি টাকা। যেহেতু এটি ৪ কোটির সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তাই পুরো ৬ কোটি টাকার ওপর ১% হারে টার্নওভার কর হচ্ছে— ৬,০০,০০,০০০ × ১% = ৬,০০,০০০ টাকা। এখানেও একই নিয়ম— ৪ কোটির উপরের অংশে নয়, বরং সম্পূর্ণ টার্নওভারের ওপর এই হার বসবে। তবে মনে রাখতে হবে, টার্নওভার কর শূন্য হওয়া মানে ব্যবসার নিয়মিত আয়করও শূন্য—এমন নয়। ব্যবসার করযোগ্য আয় থাকলে প্রচলিত নিয়মে আয়কর হিসাব করতে হবে।ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্টদের ও ইটভাটার কর কাঠামো কর ব্যবস্থাঃআমাদের দেশে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে জড়িত বিশেষায়িত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট এবং শিপিং এজেন্টদের জন্য কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান কার্যকর রয়েছে। আয়কর আইনের ধারা ১২২ অনুযায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের লাইসেন্স নবায়ন এবং পণ্য খালাসের সময় প্রাপ্ত কমিশনের ওপর সরাসরি ১০% (দশ শতাংশ) হারে উৎসে কর কর্তন করা হয়ে থাকে। কিন্তু ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এবং শিপিং এজেন্টদের ক্ষেত্রে অর্থ আইন, ২০২৬-এর সংশোধিত ধারা ১২৪-এর মাধ্যমে উৎসে কর আদায়ের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ ফর্মুলা প্রবর্তন করা হয়েছে।নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফ্রেট ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট বা শিপিং এজেন্ট কর্তৃক প্রাপ্ত মোট গ্রস বিলের ১% (এক শতাংশ) অথবা উক্ত এজেন্টের ইনভয়েসে যদি কমিশন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে তবে উক্ত কমিশনের ১০% (দশ শতাংশ)—এই দুইটির মধ্যে হিসাব কষে যে পরিমাণ করের অংকটি বেশি হবে, সেই হারেই উৎসে কর কর্তন করতে হবে। বিষয়টি একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক। ধরা যাক, একটি শিপিং এজেন্সি বিদেশ থেকে ১ কোটি টাকার একটি গ্রস বিল পেল, যার ইনভয়েসে এজেন্টের নিজস্ব কমিশন হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে ৫ লক্ষ টাকা আলাদা করে উল্লেখ আছে। এখন করের হিসাব কষলে দেখা যাবে, কমিশনের ১০% হিসেবে করের পরিমাণ আসে ৫০,০০০ টাকা এবং সম্পূর্ণ গ্রস বিলের ১% হিসেবে করের পরিমাণ আসে ১,০০,০০০ টাকা। যেহেতু গ্রস বিলের ১% অর্থাৎ ১ লক্ষ টাকা কমিশনের ১০% (৫০ হাজার টাকা) অপেক্ষা বেশি, তাই ব্যাংক এই বিল ছাড় করার সময় সরাসরি ১ লক্ষ টাকা উৎসে কর হিসেবে কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। এই নিয়মের ফলে এজেন্সির প্রকৃত লেনদেনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিকভাবে কর কর্তন নিশ্চিত হয়।পাশাপাশি ইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটাগুলোর লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নের সময় পরিবেশ বিপর্যয় রোধ ও কর আদায়ের লক্ষ্যে আইনের ধারা ১৩০-এর অধীনে অগ্রিম আয়কর আদায়ের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর নতুন প্রতিস্থাপিত ধারা ১৩০ অনুযায়ী, ইটভাটাগুলোর সেকশন বা ঘনফুটের ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে যথাক্রমে ১ লক্ষ টাকা, ১.৫ লক্ষ টাকা, ২ লক্ষ টাকা এবং ৩ লক্ষ টাকা বাৎসরিক অগ্রিম কর এ-চালানের মাধ্যমে পরিশোধের প্রমাণক দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো ইটভাটা মালিক যদি যথাসময়ে এই বাৎসরিক অগ্রিম কর পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে পরবর্তী বছর নবায়নের সময় তাঁকে পূর্ববর্তী বকেয়া করের সমপরিমাণ টাকা জরিমানা সহ আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ কর পরিশোধ করে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় এলাকাভিত্তিক উৎসে কর ও এ-চালানের বাধ্যবাধকতাঃযেকোনো ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক ভিত্তি হলো ট্রেড লাইসেন্স। আয়কর আইনের ধারা ১৩১ অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তাঁদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করার সময় এলাকা এবং ব্যবসার অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট হারে অগ্রিম উৎসে কর পরিশোধ করতে হয়। এই অগ্রিম করের হার নিম্নরূপ সাজানো হয়েছেঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য অগ্রিম কর ৩,০০০ (তিন হাজার) টাকা।দেশের অন্যান্য যেকোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রিম কর ২,০০০ (দুই হাজার) টাকা।জেলা সদরে অবস্থিত যেকোনো পৌরসভার (Pourashava Sadar) জন্য অগ্রিম করের হার ১,০০০ (এক হাজার) টাকা।অন্যান্য যেকোনো গ্রামীণ বা সাধারণ পৌরসভার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রিম করের হার ৫০০ (পাঁচশত) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের এই অগ্রিম কর পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন অর্থ আইনের মাধ্যমে একটি বড় প্রশাসনিক কঠোরতা আনা হয়েছে। পূর্বে এই ট্যাক্সের টাকা যেকোনো ব্যাংকের পে-অর্ডার বা লোকাল ম্যানুয়াল চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা যেত, কিন্তু বর্তমান নিয়মে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের অগ্রিম করের সম্পূর্ণ টাকাটি বাধ্যতামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট অনলাইন এ-চালানের (a-Challan) মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। এ-চালানের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সফল ডিজিটাল রসিদ ছাড়া কোনো সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করবে না। এই অগ্রিম কর বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।পরিশেষে বলা যায়, অর্থ আইন, ২০২৬-এর এই সুদূরপ্রসারী সংশোধনীসমূহ দেশের কর ব্যবস্থাকে একদিকে যেমন ডিজিটালাইজেশন ও শৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে করদাতাদের—বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্বাধীন পেশাজীবীদের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সাথে, নতুন ধারা ১৩০ক-এর অধীনে খুচরা ক্রয়ে ০.২% অগ্রিম কর আদায়ের মতো বিষয়গুলো অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসার কার্যকরী উদ্যোগ। তবে পূর্বের ১% ফ্ল্যাট টার্নওভার ট্যাক্সের কারণে লোকসানের মুখেও ব্যবসায়ীদের ওপর যে বিপুল করের বোঝা ও কার্যকরী মূলধন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, নতুন সংশোধনী তা অনেকাংশে প্রশমিত করেছে।

বাড়ি ভাড়ার আয়কর নিয়ম ও জামানতের ওপর কর
আমাদের সমাজে ঘর, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া দেওয়ার সময় ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা বা সিকিউরিটি ডিপোজিট নেওয়া একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা। তবে নতুন কর আইনের অধীনে বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে কর নিরূপণের নিয়মে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে — এবং এটি ২০২৬-২৭ করবর্ষের সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনি যদি কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে থাকেন বা ভবিষ্যতে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে বার্ষিক রিটার্নে ট্যাক্সের হিসাব সঠিকভাবে মেলাতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে এই নিয়মগুলো জেনে রাখা জরুরি। (বিশেষ ভাড়া আয়) ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি জামানতের ওপর করঃসাধারণত ভাড়াটিয়া ঘর বা দোকান ছেড়ে চলে গেলে তাঁর অগ্রিম বা সিকিউরিটি ডিপোজিট ফেরত দেওয়া হয়। পূর্বে বাড়িওয়ালাদের এই ফেরতযোগ্য জামানতের ওপর কোনো কর দিতে হতো না। তবে পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অর্থবছর শেষে (৩০ জুন তারিখে) বাড়িওয়ালার হাতে জমা থাকা সিকিউরিটি ডিপোজিটের যে অংশ থাকবে, তার সরাসরি ১০% অর্থ "বিশেষ ভাড়া আয়" (Special Rent Income) হিসেবে করযোগ্য আয়ের সাথে যুক্ত হবে। প্রতি বছর ৩০শে জুনের অবশিষ্টাংশের ওপর এই হার প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, আপনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা ফেরতযোগ্য জামানত নিয়েছেন এবং ৩০শে জুনেও পুরো টাকা আপনার কাছেই আছে। এই ৫ লক্ষ টাকার ১০% অর্থাৎ ৫০,০০০ টাকা আপনার করযোগ্য আয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে এবং নিয়মিত করের হার অনুযায়ী এর ওপর ট্যাক্স দিতে হবে।অফেরতযোগ্য অগ্রিম বা সেলামি বণ্টন করার বিশেষ সুবিধাঃবাণিজ্যিক সম্পত্তি বা দোকান ভাড়া দেওয়ার সময় বাড়িওয়ালারা প্রায়ই এককালীন বড় অঙ্কের অফেরতযোগ্য টাকা নেন, যাকে কর আইনে "সেলামি বা প্রিমিয়াম" (Salami or Premium) বলা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই অফেরতযোগ্য সেলামি যে বছর গ্রহণ করবেন, সে বছরই তা "বিশেষ ভাড়া আয়" হিসেবে করযোগ্য হবে। তবে করদাতাকে একটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে — পুরো টাকা এক বছরে না দেখিয়ে, লিজ বা ভাড়ার মেয়াদ অথবা সর্বোচ্চ ৫ বছর (যেটি কম), সেই মেয়াদে ইচ্ছেমতো বণ্টন করে প্রতি বছর অল্প অল্প করে কর দেওয়া যায়। যেমন, এককালীন ৫,০০,০০০ টাকা অফেরতযোগ্য সেলামি পেলেন, ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ ৭ বছর — যেহেতু ৫ বছর কম, তাই সর্বোচ্চ ৫ বছরে ভাগ করতে পারবেন। প্রতি বছর ১,০০,০০০ টাকা করে করযোগ্য আয়ের সাথে যোগ করে ট্যাক্স দিতে পারবেন, ফলে এক বছরেই বড় অঙ্কের ট্যাক্স দেওয়ার চাপ থেকে বাঁচবেন। টাকা ফেরত দেওয়ার সুবিধা: চুক্তির মাঝপথে অফেরতযোগ্য অগ্রিমের কোনো অংশ ভাড়াটিয়াকে ফেরত দিলে, সেই বছরের ভাড়া আয় হিসাবের সময় ফেরত দেওয়া অংশ বাদ দিতে পারবেন।নিয়মিত ভাড়া আয়ের ওপর মেরামতের খরচ বাবদ ছাড়ঃমোট ভাড়ামূল্যের ওপর সরাসরি হিসাব করে: বাণিজ্যিক সম্পত্তি (দোকান/অফিস) এর ক্ষেত্রে বাৎসরিক মোট ভাড়ার ৩০% মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।আবাসিক সম্পত্তি (থাকার ঘর/ফ্ল্যাট) এর ক্ষেত্রে বাৎসরিক মোট ভাড়ার ২৫% মেরামতের খরচ হিসেবে বাদ দেওয়া যাবে।ভাড়া আদায়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাধ্যবাধকতাঃনতুন কর আইনে নগদে ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সম্পত্তি ভাড়ার বিপরীতে যেকোনো প্রাপ্তি অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফার বা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রহণ করা উচিত। ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়া ভাড়া গ্রহণ করলে তিনটি সমস্যা হবে: অগ্রিমের কিস্তি সুবিধা বাতিল: ৫ লক্ষ টাকার বেশি অগ্রিম নগদে নিলে তা সরাসরি ওই বছরের "বিশেষ ভাড়া আয়" হিসেবে গণ্য হবে এবং বণ্টন/কিস্তির সুবিধা পাওয়া যাবে না।TDS ৫০% বৃদ্ধি: আইন অনুযায়ী নিয়মিত ৫% উৎসে করের জায়গায় ৭.৫% উৎসে কর কর্তন হবে।ভাড়াটিয়ার খরচ বাতিল: প্রাতিষ্ঠানিক/কর্পোরেট ভাড়াটিয়া ক্যাশে ভাড়া দিলে তা তাদের কর ফাইলে ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে দাবি করতে পারবে না।পুরো বিষয়টি আরও সহজে বোঝার জন্য আসুন আমরা একজন সাধারণ বাড়িওয়ালা জনাব আরিফের ভাড়া খাতের করযোগ্য আয়ের হিসাবটি ধাপে ধাপে দেখে নিই। তিনি গুলশানে তাঁর একটি বাণিজ্যিক স্পেস মাসিক ৫০,০০০ টাকায় ভাড়া দিয়েছেন। চুক্তির সময় তিনি ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানত নিয়েছেন এবং এককালীন ৩,০০,০০০ টাকা অফেরতযোগ্য সেলামি গ্রহণ করেছেন (যা তিনি ৫ বছরের সমহারে কর বণ্টনের সুবিধা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন)। চলুন দেখে নিই নতুন নিয়মে তাঁর ভাড়া খাতের মোট করযোগ্য আয় কত হবে: নিয়মিত ভাড়া খাতের আয় হিসাব বাৎসরিক মোট ভাড়া প্রাপ্তি (৫০,০০০ টাকা × ১২ মাস) = ৬,০০,০০০ টাকা। বাদ: বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য সংবিধিবদ্ধ মেরামত খরচ ছাড় (মোট ভাড়ার ৩০%): (১,৮০,০০০) টাকা।সুতরাং, নিয়মিত ভাড়া খাতের নিট আয় (ক) = (৬,২০,০০০ - ১,৮০,০০০) = ৪,২০,০০০ টাকা।বিশেষ ভাড়া আয় নির্ণয়ঃবিশেষ ভাড়া খাতের আয়ের হিসাব ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা জামানতের ওপর বিশেষ আয় (৫,০০,০০০ টাকার ১০%) = ৫০,০০০ টাকা। অফেরতযোগ্য সেলামির বাৎসরিক কিস্তি (৩,০০,০০০ টাকা ÷ ৫ বছর) = ৬০,০০০ টাকা। সুতরাং, মোট বিশেষ ভাড়া খাতের আয় (খ) = (৫০,০০০ + ৬০,০০০) = ১,১০,০০০ টাকা।জনাব আরিফের মোট করযোগ্য ভাড়া খাতের আয় (ক + খ) = (৪,২০,০০০ + ১,১০,০০০) = ৫,৩০,০০০ টাকা। অর্থাৎ, আগে জনাব আরিফের করযোগ্য ভাড়া খাতের আয় হতো কেবল ৪,২০,০০০ টাকা। কিন্তু নতুন আইনের কারণে ফেরতযোগ্য জামানত ও সেলামি নেওয়ার ফলে তাঁর করযোগ্য আয়ের সাথে অতিরিক্ত ১,১০,০০০ টাকা যুক্ত হয়ে নিয়মিত হারে কর পরিশোধ করতে হবে।

২০২৬-২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন (E-Return) জমার পোর্টাল আপডেট
২২ জুলাই ২০২৬ থেকে etaxnbr.gov.bd-এর অনলাইন সার্ভার নতুন করবর্ষের জন্য সম্পূর্ণ আপডেট করা হয়েছে। এখন থেকে করদাতারা অত্যন্ত সহজে ২০২৬-২৭ করবর্ষের বার্ষিক আয়কর রিটার্ন অনলাইনে জমা দিতে পারবেন।২০২১ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু হলেও প্রতি বছরই করদাতার সুবিধার জন্য এই পোর্টালটি আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় করা হয়। গত ২০২৫-২৬ করবর্ষে রেকর্ড ৪৭ লক্ষ করদাতা এই ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করে ঘরে বসেই তাদের রিটার্ন জমা দিয়েছেন।জুলাই–সেপ্টেম্বরে জমা দিলে যা পাবেনঃঅর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী এবার রিটার্ন জমার সময়ের ওপর সরাসরি করের হিসাব নির্ভর করবে। কবে জমা দিচ্ছেন সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।১ জুলাই — ৩০ সেপ্টেম্বরঃ নিট প্রদেয় করের ওপর সরাসরি ৫% ছাড়, সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা। এই উইন্ডো একবার বন্ধ হলে আর পাওয়া যাবে না।১ অক্টোবর — ৩১ ডিসেম্বরঃ কোনো ছাড় নেই, কোনো জরিমানাও নেই। স্বাভাবিক সময়।১ জানুয়ারি — ৩১ মার্চঃ প্রদেয় করের ২% অথবা ৩,০০০ টাকা বিলম্ব কর — যেটি বেশি।১ এপ্রিল — ৩০ জুনঃ প্রদেয় করের ৫% অথবা ৫,০০০ টাকা বিলম্ব কর — যেটি বেশি।বিস্তারিত জানুন: রিটার্ন দাখিলের নতুন সময়সীমা ও Year-Round Filingদেরিতে দিলে শুধু জরিমানা নয়, আরও বড় ক্ষতিএখানেই বেশিরভাগ করদাতা ভুল করেন। দেরিতে রিটার্ন দিলে জরিমানার পাশাপাশি কর রেয়াত (Tax Rebate) এবং ষষ্ঠ তফসিলের অধিকাংশ কর অব্যাহতির সুবিধা সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে।২০২৬-২৭ করবর্ষে রেয়াতের হার আগের চেয়ে কমই আছে — বিনিয়োগের ওপর ১০%, সর্বোচ্চ ৭.৫ লাখ। এই সুবিধাটুকুও বিলম্বে রিটার্ন দিলে আর থাকবে না। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতি জরিমানার চেয়ে অনেক বেশি।কাদের অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক নয়?সকল স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন বাধ্যতামূলক। তবে নিচের শ্রেণির করদাতারা পেপার রিটার্ন দিতে পারবেন:৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা (সনদ সাপেক্ষে), বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী করদাতা, মৃত করদাতার পক্ষে প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিক।প্রথমবার ও প্রবাসী করদাতাদের জন্য বিশেষ সুবিধাপ্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারী: আপনি যদি জীবনে প্রথমবার করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে রিটার্ন দিতে যান, তবে কোনো বিলম্ব কর বা জরিমানা ছাড়াই আয়বর্ষ শেষের পরবর্তী বছর অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত যেকোনো দিন রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।প্রবাসী করদাতা: বিদেশে অবস্থানরত করদাতারা দেশে ফেরার দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে কোনো প্রকার বিলম্ব জরিমানা ছাড়াই রিটার্ন দাখিল করার আইনি সুবিধা পাবেন।কীভাবে অনলাইনে রিটার্ন দেবেনetaxnbr.gov.bd পোর্টালে গিয়ে আপনার বায়োমেট্রিক সিম দিয়ে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ও টিআইএন (E-TIN) ব্যবহার করে সাইন-ইন করুন। প্রয়োজনীয় তথ্যাদি প্রদানের পর ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড অথবা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) ব্যবহার করে এ-চালানের মাধ্যমে প্রদেয় কর পরিশোধ করা যাবে। সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন সাবমিট করামাত্রই পোর্টাল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (PSR) এবং আয়কর সনদ ডাউনলোড করে নেওয়া যাবে।রিটার্ন দাখিলের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিন: রিটার্ন দাখিলের চেকলিস্ট। আয়ের উৎস একাধিক হলে, সারচার্জের বিষয় থাকলে বা হিসাব জটিল মনে হলে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। একজন NBR-তালিকাভুক্ত আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

আয়কর রিটার্ন দাখিলের নতুন সময়সীমা -Tax Day বাতিল, চালু হলো Year-Round Filing
বাংলাদেশে আয়কর ব্যবস্থাপনায় (Income Tax Management) করদাতাদের জন্য একটি যুগান্তকারী সংস্কার এসেছে। অর্থ আইন ২০২৬-এর সংশোধনীতে "ট্যাক্স ডে" নামের পুরনো কনসেপ্ট সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এর জায়গায় ধারা ১৭০-এর অধীনে চালু হয়েছে Year-Round Return Filing ব্যবস্থা, যেখানে করদাতারা সারা বছর ধরে যেকোনো সময় রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।তবে করদাতারা (স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার) অর্থবছরের ঠিক কোন সময়ে তাদের রিটার্ন দাখিল করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে করদায়ে বিশেষ ছাড় (Incentive) অথবা অতিরিক্ত বিলম্ব করের সময়োপযোগী আইনি বিধান সংযোজিত হয়েছে। নিচে রিটার্ন দাখিলের সংশোধিত সময়সূচি, জরিমানার হার এবং বিশেষ আইনি বিষয়গুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলোঃ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর — আগাম রিটার্ন দাখিলে ৫% বিশেষ কর ছাড় (Early-Bird Rebate): যারা বছরের শুরুতেই সুশৃঙ্খলভাবে রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা রাখা হয়েছে। এই ৩ মাসের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতা তার নিয়মিত প্রদেয় করের ওপর সরাসরি ৫% কর ছাড় বা প্রণোদনা পাবেন (যার সর্বোচ্চ আইনি সীমা ২৫,০০০ টাকা)।১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর — নিয়মিত ও স্বাভাবিক সময়সীমা: এই সময়কালকে রিটার্ন দাখিলের সাধারণ বা নিয়মিত সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই সময়ে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত কোনো জরিমানা বা বিলম্ব কর দিতে হবে না, তবে আগাম জমা দেওয়ার কোনো বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যাবে না।১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ — প্রথম ধাপের বিলম্ব কর: ৩১ ডিসেম্বরের নিয়মিত সময় পার হওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করলে তা "বিলম্বে রিটার্ন" (Late Return) হিসেবে গণ্য হবে। এই ৩ মাসের মধ্যে বিলম্ব রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ২% অতিরিক্ত কর অথবা ফ্ল্যাট ৩,০০০ টাকা (এই দুইটির মধ্যে যেটি বেশি) বিলম্ব কর বা জরিমানা হিসেবে প্রদেয় হবে।১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন — দ্বিতীয় ধাপের বিলম্ব কর: বিলম্বের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে, অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ ৩ মাসের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা হলে জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এই সময়ে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রদেয় করের ওপর সরাসরি ৫% অতিরিক্ত বিলম্ব কর অথবা ৫,০০০ টাকা (এই দুইটির মধ্যে যেটি বেশি) পরিশোধ করতে হবে।বিশেষ শ্রেণীর করদাতাদের জন্য রিটার্ন জমার সময়সীমায় ব্যতিক্রমঃকরদাতাদের করজালে অভ্যস্ত করতে এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স ও অবদানকে সম্মান জানাতে আইনের নতুন সংশোধনীতে বিশেষ দুটি শ্রেণীকে বিলম্ব জরিমানার সাধারণ নিয়ম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হয়েছে। এর ফলে তারা দেশে ফিরে বা প্রথম বছরের জন্য কোনো বাড়তি মানসিক চাপ ছাড়াই কর ফাইল গোছানোর পর্যাপ্ত অবকাশ পাবেন। প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারী করদাতা (First-time Filer): যেসকল স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা জীবনে প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিলম্ব করের সাধারণ নিয়মটি প্রযোজ্য হবে না। তারা কোনো অতিরিক্ত জরিমানা বা বিলম্ব কর ছাড়াই আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত বছরের যেকোনো দিন তাদের প্রথম রিটার্নটি দাখিল করার অনন্য আইনি সুবিধা পাবেন। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী প্রবাসী করদাতা: উচ্চশিক্ষা, লিয়েনে চাকরি বা বাৎসরিক মেয়াদে বৈধ ভিসায় দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশী করদাতাদের স্বস্তি দিতে বিশেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বাংলাদেশে পুনরায় প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে পরবর্তী ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে কোনো প্রকার বিলম্ব কর বা জরিমানা ছাড়াই নিরাপদে তাদের বার্ষিক রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন করতে পারবেন।২০২৬-২০২৭ করবর্ষের করমুক্ত আয়সীমা এবং করহার জানুনপ্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের জন্য নির্ধারিত রিটার্ন দাখিলের সময়সীমাঃকোম্পানি, অংশীদারি ফার্ম ও ব্যক্তিসংঘের জন্য ভিন্ন আইনি বাধ্যবাধকতা স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের মতো সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সাধারণ বা নমনীয় বিধানটি কোম্পানি ও অংশীদারি ফার্মের মতো প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ব্যবসার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করতে আইনের সংশোধনীতে তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক সময়সীমা: আইনের নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা ব্যতীত অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের (যেমন লিমিটেড কোম্পানি বা ব্যক্তিসংঘ) জন্য রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা হবে—সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী নবম মাসের ১৫তম দিন অথবা যেক্ষেত্রে উক্ত ১৫তম দিনটি ১৫ সেপ্টেম্বরের পূর্বের তারিখে পড়ে, সেক্ষেত্রে আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখের মধ্যে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে।বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের আইনি ক্ষতিঃঅর্থ আইন, ২০২৬-এর অন্যতম কঠোর একটি সংস্কার হলো বিলম্ব রিটার্নের ক্ষেত্রে করদাতার কর অব্যাহতির সুযোগ অত্যন্ত সংকুচিত করা। আপনি যদি কোনো কারণে ৩১ ডিসেম্বরের নিয়মিত সময়সীমা পার হওয়ার পর রিটার্ন দাখিল করেন, তবে জরিমানার পাশাপাশি আপনার বাৎসরিক আয়ের ওপর প্রদেয় করের হিসাব বদলে যাবে। আইনের সংশোধিত ধারা ১৭৪ অনুযায়ী, কোনো করদাতা যদি বিলম্ব রিটার্ন (Late Return) দাখিল করেন, তবে তিনি তাঁর নিয়মিত কর রেয়াত (Tax Rebate) এবং ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী প্রাপ্ত অধিকাংশ খাতের কর অব্যাহতির (Tax Exemption) আইনি অধিকার সম্পূর্ণরূপে হারাবেন। আইনি ব্যতিক্রম: বিলম্ব রিটার্ন দিলেও করদাতার অধিকার সুরক্ষায় শুধুমাত্র চাকরি বা চাকরি খাতের বেতন থেকে আয়, পেনশন, প্রাইজবন্ড বা লটারির পুরস্কার, বৈধ রিমিট্যান্স, সঞ্চয়পত্রের সুদ এবং উপহার বা দান থেকে প্রাপ্ত আয়ের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি বা হ্রাসকৃত করের আইনি সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকবে। তবে অন্যান্য সকল খাতের আয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত সাধারণ উচ্চ হারেই কর পরিগণনা করা হবে, যা করদাতার সামগ্রিক করদায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থাপনায় যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তা আধুনিক ও করদাতাবান্ধব বলা যায়। করদাতার জন্য কোনো অনমনীয় নির্দিষ্ট শেষ তারিখ বা "কর দিবস / Tax Day" আরোপ না করে সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া নিশ্চিতভাবেই করদাতাদের মানসিক চাপ দূর করতে সহায়তা করবে। তবে সারা বছর রিটার্ন দেওয়ার স্বাধীনতা থাকলেও বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কর রেয়াত এবং ষষ্ঠ তফিসলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর অব্যাহতিগুলো বাতিলের যে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, তা করদাতাদের সময়মতো ফাইল জমার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়।একই সাথে, আর্লি বার্ড রেয়াতের মতো কর ছাড়ের প্রণোদনা এবং করদাতাদের হয়রানি কমাতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (EFT) মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত (Automated Refund) প্রবর্তন করা কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতারই বহিঃপ্রকাশ। তাই নতুন কর আইনের এই ইতিবাচক সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রথম কোয়ার্টার অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কর ফাইল প্রস্তুত করে তা দাখিল করাই হবে একজন সচেতন ও দূরদর্শী করদাতার জন্য সর্বোত্তম আইনি ও আর্থিক সিদ্ধান্ত।

বাজেট ২০২৬-২৭: আয়কর ও কর্পোরেট ট্যাক্স কাঠামোর সম্পূর্ণ গাইড | Bangladesh Income Tax 2026-27
(৩০শে জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত অর্থ আইন ২০২৬ অনুসারে)ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এবারের বাজেটের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, কর ব্যবস্থার সহজীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে করদাতাদের জন্য একটি পূর্বাভাসযোগ্য (predictable) কাঠামো তৈরি করা।এবারের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ আয়কর (Income Tax Bangladesh 2026-27) ব্যবস্থায় এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। করদাতারা যেন আগে থেকেই আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারেন, সেজন্য প্রথমবারের মতো আগামী ৫ বছরের Predictable Tax Structure ঘোষণা করা হয়েছে। আয়কর রিটার্ন ২০২৬, ট্যাক্স স্ল্যাব, করমুক্ত আয়সীমা এবং কর্পোরেট ট্যাক্স রেট — সব কিছু এক জায়গায় জেনে নিন। করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ (Tax-Free Income Limit Bangladesh)বিভিন্ন শ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা (Tax Exemption Limit) ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হচ্ছেঃকরদাতার শ্রেণি২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০২০৩০-৩১সাধারণ করদাতা৪,০০,০০০ টাকা৪,৫০,০০০ টাকা৫,০০,০০০ টাকানারী ও ৬৫+ বয়স্ক৪,৫০,০০০ টাকা৫,০০,০০০ টাকা৫,৫০,০০০ টাকাপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গ৫,২৫,০০০ টাকা৫,৭৫,০০০ টাকা৬,২৫,০০০ টাকাযুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধা৫,৫০,০০০ টাকা৬,০০,০০০ টাকা৬,৫০,০০০ টাকা📌 প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতা-মাতার ক্ষেত্রে সন্তান প্রতি অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা করমুক্ত সুবিধা প্রযোজ্য।ব্যক্তিগত আয়করের ট্যাক্স স্ল্যাব ২০২৬-২৭ (Individual Income Tax Slab Bangladesh)সাধারণ করদাতাদের জন্য ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রযোজ্য আয়কর হার (Income Tax Rate Bangladesh):আয়ের ধাপকরের হারপ্রথম ৪,০০,০০০ টাকা০%পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা১০%পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা১৫%পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা২০%পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা২৫%অবশিষ্ট সকল আয়৩০%📌 ২০২৮-২৯ সাল থেকে স্ল্যাব আরও শিথিল হবে এবং সর্বোচ্চ হার ৩৫%-এ উন্নীত হবে।কর্পোরেট ট্যাক্স রেট ২০২৬-২৭ (Corporate Tax Rate Bangladesh)বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে কর্পোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছেঃকোম্পানির ধরনকরের হারপাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানি২২.৫% (ব্যাংকিং লেনদেনে ২০%)নন-লিস্টেড কোম্পানি২৭.৫% (ব্যাংকিং লেনদেনে ২৫%)ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান৩৭.৫% (লিস্টেড) / ৪০% (নন-লিস্টেড)মোবাইল অপারেটর৪৫% (শর্তসাপেক্ষে ৪০%)তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক৪৫% + ২.৫% সারচার্জবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও আইটি কলেজ৫%বাজেট ২০২৬-২৭: আয়কর বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনসমূহঃফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত: আইটি-বহির্ভূত সকল ফ্রিল্যান্সিং আয় (Freelancer Tax Exemption Bangladesh), উদ্ভাবনী কাজ এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত করা হয়েছে।স্টার্টআপ ও SME ট্যাক্স সুবিধা (Startup Tax Bangladesh): তরুণ উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপের টার্নওভার ট্যাক্স ০%। SME উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত।ন্যূনতম কর বাতিল (Minimum Tax Abolished): উৎসে কাটা কর (TDS) এখন থেকে শুধু "অগ্রিম কর" হিসেবে গণ্য হবে। অতিরিক্ত কর কাটা হলে তা ফেরত (Tax Refund Bangladesh) বা সমন্বয় করা যাবে।ব্যাংক হিসাব খুলতে বা সচল রাখতে ই-টিন (E-TIN) এর বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই নতুন এবং পূর্বাভাসযোগ্য (Predictable) কর কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের করদাতাদের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এবারের বাজেটে যে নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে। কর ব্যবস্থার এই আধুনিকীকরণ যেমন সাধারণ মানুষের জন্য কর দেওয়া সহজ করবে, তেমনি দেশের সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামোকেও শক্তিশালী করবে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কর আইনের এই পরিবর্তনগুলো জানা এবং সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।

করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও আয়কর বাড়ছে কেন? | Tax Rebate Bangladesh 2026-27
(৩০শে জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত অর্থ আইন ২০২৬ অনুসারে)বাজেটের খবর শোনার পর আমাদের অনেকেরই মনে হয়েছিল—যাক, করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বেড়ে ৪ লাখ টাকা (অর্থ আইন, ২০২৬ - ৩০ জুন, ২০২৬ অনুযায়ী) হওয়ায় এবার হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হিসাবের খাতা মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় হয়তো আমাদের পকেট থেকে আগের চেয়ে একটু বেশিই আয়কর চলে যেতে পারে। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও, নতুন আইনের কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তনের কারণেই মূলত এমনটা ঘটছে।ধরে নিই, জনাব শাহীন একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, যাঁর বার্ষিক আয় ২৫ লাখ টাকা। নতুন ট্যাক্স স্ল্যাব অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা ৩.৫০ লাখ থেকে বেড়ে ৪ লাখ টাকা হওয়ায় তিনি ভাবছেন, এবার হয়তো তাঁর ট্যাক্স কিছুটা কমবে। কিন্তু একজন আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।আগে তিনি ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ১৫% হারে ৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত পেতেন। কিন্তু এখন চূড়ান্ত অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী রেয়াতের হার এক ধাক্কায় ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে। ফলে এখন তিনি রেয়াত পাবেন মাত্র ৫০,০০০ টাকা।ফলাফল কী দাঁড়াল? করমুক্ত আয়ের প্রাথমিক সীমা ৫০,০০০ টাকা বাড়ার কারণে তিনি যে সামান্য সুবিধা পেয়েছিলেন, রেয়াতের হার কমার কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা তিনি হারিয়েছেন। হিসাব শেষে দেখা গেল, আয় ও বিনিয়োগ সমান থাকার পরও নতুন আইনি কাঠামোর কারণে জনাব শাহীনকে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩২,৫০০ টাকা অতিরিক্ত আয়কর গুনতে হচ্ছে।আইনি ধাক্কাটি কোথায়?আইনের আসল চাপটি লুকিয়ে আছে 'বিনিয়োগ রেয়াত' বা Tax Rebate-এর নতুন কাঠামোতে। নতুন অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী রেয়াত পাওয়ার তিনটি সীমার মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম, আপনি সেটাই ছাড় হিসেবে পাবেন:মোট করযোগ্য আয়ের ৩%মোট বিনিয়োগের ১০% (আগে ছিল ১৫%)সর্বোচ্চ আইনি সীমা ৭.৫০ লাখ টাকা (আগে ছিল ১০ লাখ)এর মানে হলো, আয় বাড়লেও আপনার কর বাঁচানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। তাই অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সঠিক কর পরিকল্পনা করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।তাহলে আইনিভাবে কর কমানোর উপায় কী?একজন আয়কর আইনজীবী হিসেবে আমার পরামর্শ হলো — এখন আর গতানুগতিক শুধু সঞ্চয়পত্রে টাকা ফেলে রাখলে চলবে না। আপনার বিনিয়োগ পোর্টফোলিওকে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে বৈচিত্র্যময় করতে হবে।স্মার্ট বিনিয়োগ বণ্টনঃ সব টাকা এক খাতে না রেখে আইনের সীমা অনুযায়ী ভাগ করে বিনিয়োগ করুন। তফসিলি ব্যাংকে DPS-এ বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার, সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ এবং সরকারি ট্রেজারি বন্ডে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে আইনি সুবিধা নিতে পারেন। সেই সাথে জীবন বীমার প্রিমিয়াম এবং সার্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রদত্ত চাঁদাও দারুণ কর-সাশ্রয়ী হাতিয়ার।অনুদানকে 'ট্যাক্স শিল্ড' হিসেবে ব্যবহারঃ আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট খাতে দান করলে কর রেয়াতের সুবিধা পাওয়া যায়। সরকারি যাকাত তহবিল, আইসিডিডিআরবি, সিআরপি, ব্র্যাক, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর বা ঢাকা আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে অনুদান আপনার করের বোঝাকে আইনিভাবে কমিয়ে আনবে। প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান, থ্যালাসেমিয়া সমিতি বা অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনে দান করেও করছাড় পাওয়া সম্ভব।সারচার্জ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনাঃ যাদের নিট সম্পদ ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, তাদের নিট করের ওপর ১০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত অতিরিক্ত সারচার্জ দিতে হবে। তাই বছর শেষে তাড়াহুড়ো না করে এখন থেকেই আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে সম্পদ পরিকল্পনা করে সারচার্জের চাপ থেকে বৈধভাবে মুক্ত থাকা সম্ভব। সারচার্জের বিস্তারিত হিসাব ও নিয়ম জানা থাকলে অডিটের ঝুঁকিও কমে।আয়করের হিসাব এখন আর কেবল ক্যালকুলেটরের সাধারণ যোগ-বিয়োগ নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি আইনি কৌশল। একটু ভুল হিসাব বা পুরোনো ধারার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কারণে আপনি না জেনেই হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত কর দিয়ে ফেলবেন।আপনার ব্যক্তিগত আয়, সম্পদ ও পেশার ওপর ভিত্তি করে কীভাবে Legal Tax Planning করলে সর্বোচ্চ আইনি সুবিধা পাবেন, তা জানতে একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিতে পারেন।

স্বর্ণ বা গহনা বিক্রিতে আয়কর ২০২৬-২৭: TDS, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ও নতুন নিয়মে যা পরিবর্তন আসতে পারে
(৩০শে জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত অর্থ আইন ২০২৬ অনুসারে)দৈনন্দিন জীবনে বিপদে-আপদে কিংবা নতুন ডিজাইনের গহনা বানাতে পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করা আমাদের কাছে খুবই সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু জানেন কি, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত চূড়ান্ত 'অর্থ আইন, ২০২৬'-এ স্বর্ণ বিক্রির ওপর ট্যাক্সের বিষয়ে একটি বড় পরিবর্তন এনে তা পাস করা হয়েছে।১. আগে কেমন ছিল, এখন কেমন হতে পারেঃআগে: আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত ব্যবহারের অলংকার 'মূলধনী সম্পদ' (Capital Asset)-এর সংজ্ঞার বাইরে ছিল। ফলে স্বর্ণ, রৌপ্য, অলংকার বা রত্ন-হীরক বিক্রিতে কোনো কর দিতে হতো না।এখন: চূড়ান্ত 'অর্থ আইন, ২০২৬' এ আয়কর আইনের ধারায় পরিবর্তন এনে ব্যক্তিগত স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক, ধাতব মুদ্রা, মূল্যবান ধাতু বা চিত্রকর্ম হস্তান্তর থেকে অর্জিত মুনাফাকে স্পষ্টভাবে "মূলধনী মুনাফা" (Taxable Capital Gain) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করে লাভ হলে তার ওপর আইন অনুযায়ী কর দিতে হবে।২. বিক্রির সময় উৎসে কর (TDS) কর্তনঃজুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণ বিক্রি করলে নতুন যুক্ত হওয়া ধারা অনুযায়ী আপনি যখন কোনো জুয়েলারি বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে আপনার পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করতে যাবেন, তখন ব্যবসায়ী মোট বিক্রয়মূল্যের ওপর ০.৫% (শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ) হারে উৎসে কর (TDS) কেটে রেখে সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন।উদাহরণ: আপনি যদি জুয়েলারি দোকানে ১০,০০,০০০ (১০ লাখ) টাকার স্বর্ণ বিক্রি করেন, তবে দোকানদার আপনার থেকে ০.৫% হারে অর্থাৎ ৫,০০০ টাকা কর কেটে রাখবেন এবং আপনাকে নিট ৯,৯৫,০০০ টাকা পরিশোধ করবেন। এই কেটে রাখা ৫,০০০ টাকার জন্য জুয়েলার্স আপনাকে একটি সার্টিফিকেট প্রদান করবে যা আপনার চূড়ান্ত করদায়ের সাথে সমন্বয় করা যাবে।৩. মুনাফার ওপর করের হার পাঁচ শতাংশঃবাজেটের খসড়া প্রস্তাবে স্বর্ণ বিক্রির লাভের ওপর সর্বোচ্চ ১৫% পর্যন্ত করের প্রস্তাব করা হলেও, সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে চূড়ান্ত গেজেটে করের হার অনেক কমানো হয়েছে। গেজেটের চূড়ান্ত তফসিল অনুযায়ী, ব্যবসায়িক পণ্য নয় এমন ব্যক্তিগত স্বর্ণ, রৌপ্য বা অলংকার বিক্রির মূলধনী আয়ের ওপর ফ্ল্যাট মাত্র ৫% (পাঁচ শতাংশ) কর প্রযোজ্য হবে। এখানে স্বর্ণটি কত বছর আপনার কাছে ছিল (Holding Period) তার ওপর ভিত্তি করে করের হার পরিবর্তন হবে না। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ৫ ভরি স্বর্ণ ১০,০০,০০০ টাকায় বিক্রি করলেন এবং গহনাটি তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন (যার অর্জন মূল্য শূন্য)। এক্ষেত্রে তার মোট মূলধনী আয়: ১০,০০,০০০ টাকা। চূড়ান্ত গেজেট অনুযায়ী ৫% ফ্ল্যাট কর: ৫০,০০০ টাকা। বিক্রির সময় জুয়েলারি দোকানদার আগেই উৎসে কর কেটে রেখেছেন: ৫,০০০ টাকা (০.৫% TDS) । সুতরাং, চূড়ান্ত প্রদেয় কর: ৫০,০০০ − ৫,০০০ = ৪৫,০০০ টাকা।সাধারণ করদাতাদের জন্য ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রযোজ্য আয়কর হার (Income Tax Rate Bangladesh) জানুনপরামর্শঃএখন থেকে স্বর্ণ বিক্রির লাভ করযোগ্য আয়, তাই মুনাফার সঠিক হিসাবের জন্য স্বর্ণ কেনার পুরোনো রসিদ বা মেমো থাকা অত্যন্ত জরুরি। মেমো না থাকলে কেনা দাম প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে এবং অতিরিক্ত কর গুনতে হতে পারে। তাই সকল স্বর্ণের মেমো যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।

অগ্রিম আয়কর ৪র্থ কিস্তি পরিশোধের শেষ তারিখ ১৫ জুন ২০২৬
আজ ২ জুন ২০২৬। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। আপনি যদি অগ্রিম আয়কর (Advance Tax) প্রদানকারী একজন করদাতা হন, তাহলে আগামী ১৫ জুন ২০২৬ তারিখটি আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ২০২৫-২০২৬ আয়বর্ষের অগ্রিম আয়করের ৪র্থ ও সর্বশেষ কিস্তি পরিশোধের শেষ তারিখ।সময়মতো পরিশোধ না করলে আপনাকে ‘খেলাপি করদাতা’ (Assessee-in-default) হিসেবে গণ্য করা হবে এবং বার্ষিক ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত সুদ গুনতে হতে পারে।অগ্রিম আয়কর (Advance Tax) কী এবং কেন দিতে হয়?অগ্রিম কর হলো চলতি বছরের আয়ের ওপর বছর শেষ হওয়ার আগেই কিস্তিতে কিস্তিতে সরকারকে প্রদত্ত আয়কর। এটি মূলত সরকারের রাজস্ব প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য আরোপ করা হয় এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর অধীনে এটি বাধ্যতামূলক।কাদের অগ্রিম কর দিতে হবে?আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, সর্বশেষ আয়বর্ষে করদাতার মোট আয় যদি ১০ লক্ষ টাকার বেশি (অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী আপডেট, পূর্বের বছরগুলোতে এই সীমা ছিল ৬ লক্ষ টাকা) হয়, তাহলে চলতি অর্থবছরে অগ্রিম কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।যেসব আয়ের ওপর অগ্রিম কর প্রযোজ্য নয়:আয়ের ধরনশর্তকৃষি খাতের আয়৮ লক্ষ টাকার মধ্যে হলেমূলধনি আয় (Capital Gains)সর্বদা প্রযোজ্য নয়এককালীন / অনিয়মিত আয়সর্বদা প্রযোজ্য নয়নতুন করদাতাদের জন্য বিশেষ বিধান:যদি আপনি প্রথমবার রিটার্ন দাখিল করতে যাচ্ছেন এবং চলতি বছরে আপনার আয় ১০ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে আপনাকেও ১৫ জুনের মধ্যে উপকর কমিশনারের নিকট আয়ের একটি প্রাক্কলন (Estimate) জমা দিয়ে অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হবে।অগ্রিম কর পরিশোধের কিস্তির সময়সূচিঃআয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অগ্রিম কর বছরে ৪টি সমান কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয় (প্রতিটি কিস্তি মোট করের ২৫%) ।কিস্তিপরিশোধের শেষ তারিখপরিমাণ১ম কিস্তি১৫ সেপ্টেম্বরমোট করের ২৫%২য় কিস্তি১৫ ডিসেম্বরমোট করের ২৫%৩য় কিস্তি১৫ মার্চমোট করের ২৫%৪র্থ কিস্তি১৫ জুন ← মোট করের ২৫%⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: নির্ধারিত তারিখ সরকারি ছুটির দিন হলে পরবর্তী কর্মদিবসে পরিশোধ করা যাবে।সময়মতো অগ্রিম কর না দিলে কী হবে?১. সরল সুদ আরোপ (Simple Interest): বছর শেষে কর নির্ধারণের পর যদি প্রমাণিত হয় যে আপনার পরিশোধিত অগ্রিম কর ও উৎসে কর্তিত করের সমষ্টি প্রকৃত নিরূপিত করের ৭৫%-এর কম, তাহলে ঘাটতি টাকার ওপর বার্ষিক ১০% হারে সরল সুদ গুনতে হবে।২. সুদের হার ৫০% বৃদ্ধি (রিটার্ন না দিলে): নির্ধারিত তারিখের মধ্যে আয়কর রিটার্নও দাখিল না করলে উপরোক্ত সুদের হার আরও ৫০% বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ তখন সুদের হার দাঁড়াবে বার্ষিক ১৫%।৩. "খেলাপি করদাতা" হিসেবে চিহ্নিত হওয়া: নির্ধারিত সময়ে অগ্রিম কর না দিলে করদাতাকে আইনত Assessee-in-default বা খেলাপি করদাতা হিসেবে গণ্য করা হবেকর-পরিকল্পনা একটি ধারাবাহিক আইনি প্রক্রিয়া। এটি শুধু বছর শেষের কাজ নয় — সারা বছর সঠিক হিসাব রাখা এবং সময়মতো কর পরিশোধ করা একজন দায়িত্বশীল করদাতার পরিচয়। সুতরাং,১৫ জুন ২০২৬ আসার আগেই: আপনার মোট আনুমানিক আয়ের হিসাব করুন।পূর্ববর্তী কিস্তির রেকর্ড মিলিয়ে নিন।৪র্থ কিস্তির বাকি অংক পরিশোধ করুন।পরিশোধের প্রমাণ (চালান/ব্যাংক ডকুমেন্ট) সংরক্ষণ করুন। হিসাবে জটিলতা থাকলে অথবা নতুন করদাতা হলে একজন NBR-নিবন্ধিত অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ ।

অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে করদাতাদের কিছু জরুরি করণীয় (Year-End Tax Checklist)
৩০ জুন মাত্র দেড় মাস দূরে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে এই সময়টাই আপনার শেষ সুযোগ সঠিক কর-পরিকল্পনা করার এবং বাড়তি কর বাঁচানোর। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী কিছু কাজ এখনই সম্পন্ন করলে পরবর্তী করবর্ষে সম্পূর্ণ কর সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবেন।তবে তার আগে অর্থবছর ও করবর্ষ - এই দুইটি বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা দেওয়া উচিত।অর্থবছর ও করবর্ষ: দুটো আলাদা বিষয় অনেকেই অর্থবছর ও করবর্ষ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিষয়টি সহজ —অর্থবছর (Income Year): ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। এই সময়ে আপনি যা আয় করেন, যা খরচ করেন — সেটাই হিসাবের ভিত্তি। চলতি অর্থবছর ২০২৫-২০২৬ শেষ হবে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে।করবর্ষ (Assessment Year): অর্থবছর শেষ হওয়ার পরের বছরটি। অর্থাৎ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে যা আয় করলেন, তার উপর ভিত্তি করে ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল করতে হবে — সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে।সহজ কথায়: আগে আয় করো, পরের বছর হিসাব দাও। তাই এখন যে বিনিয়োগ বা লেনদেন করবেন, সেটার প্রভাব পড়বে আগামী করবর্ষের রিটার্নে।চলুন একে একে দেখে নেওয়া যাক অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে করদাতাদের করনীয় কিছু বিষয়াবলীঃকর রেয়াত পেতে বিনিয়োগ সম্পন্নকরণ (Tax Rebate Planning): আসন্ন করবর্ষে কর রেয়াত পেতে চাইলে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। যেমনঃ - ডিপিএস-এ কিস্তি জমা (বার্ষিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত) - সঞ্চয়পত্র ক্রয় - জীবন বিমার প্রিমিয়াম প্রদান - শেয়ার বাজারে নতুন বিনিয়োগ, ইত্যাদি।৩০ জুনের পরে বিনিয়োগ করলে তা এই বছরের কর রেয়াতে গণ্য হবে না — পুরো সুবিধাটি হারিয়ে যাবে।অগ্রিম আয়করের শেষ কিস্তি পরিশোধ (Advance Tax Payment): পূর্ববর্তী আয়বর্ষে আয় ৬ লক্ষ টাকার বেশি হলে ১৫ জুন ২০২৬-এর মধ্যে অগ্রিম আয়করের চতুর্থ তথা শেষ কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে না দিলে পরবর্তীতে অতিরিক্ত সরল সুদ ও জরিমানা আরোপিত হবে — যা সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব ছিল।ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন নিশ্চিতকরণ (Banking Channel Compliance): আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী কর্মচারীদের বেতন এবং প্রতিষ্ঠানের ভাড়া যেকোনো পরিমাণ হোক না কেন অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ করতে হবে। অন্যান্য খরচের ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের ৫০%-এর বেশি নগদে পরিশোধ করা যাবে না — করলে নগদে পরিশোধিত অঙ্কের ২৫% খরচ বাতিল হয়ে 'বিশেষ ব্যবসা আয়' হিসেবে গণ্য হবে এবং করের বোঝা বেড়ে যাবে। তাই জুন শেষ হওয়ার আগেই বড় পেমেন্টগুলো ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করুন।হিসাবের খাতা ও ভাউচার হালনাগাদকরণ (Year-end Book Closing): আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী খরচের সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ না থাকলে আয়কর অডিটের সময় সেই খরচ বাতিল হয়ে যাবে। তাই অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নিচের বিষয়গুলো গুছিয়ে ফেলুন — - আয়-ব্যয়ের হিসাব (১ জুলাই ২০২৫ হতে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত) - ব্যাংক স্টেটমেন্ট (১ জুলাই ২০২৫ হতে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত) - চালান ও খরচের ভাউচার (১ জুলাই ২০২৫ হতে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত)উৎসে করের রিটার্ন (TDS Return) প্রস্তুতি: কোম্পানি ও ফার্মগুলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে TDS রিটার্ন জমা দিতে হয়। চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের (এপ্রিল, মে ও জুন) উৎসে করের রিটার্ন জমার শেষ তারিখ ২৫ জুলাই ২০২৬। এখন থেকেই অর্থ পরিশোধের বিপরীতে TDS চালানগুলো সংগ্রহ করে রাখুন।কর-পরিকল্পনা কোনো একদিনের কাজ নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক আইনি প্রক্রিয়া। শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো এড়াতে এবং সম্পূর্ণ কর সুবিধা নিশ্চিত করতে আজই আপনার হিসাবগুলো মিলিয়ে নিন। ব্যবসার কর-পরিকল্পনা নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকলে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন — সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই স্মার্ট করদাতার পরিচয়।

অংশীদারি ফার্মের আয়কর অডিট ও অ্যাসেসমেন্ট: একটি বাস্তব Case Study
আয়কর অডিটে পড়লে কী হয়? শুধু জরিমানা নয় — সঠিক কমপ্লায়েন্স না থাকলে কোটি টাকার খরচ বাতিল হতে পারে, 'খেলাপি করদাতা' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি বাস্তব কেইস স্টাডি দেখে নেওয়া যাক।প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি (Context & Legal Basis): শুরুতেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই অডিট ও অ্যাসেসমেন্টটি ২০২১-২০২২ করবর্ষের। সেই সময়ে বাংলাদেশে 'ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪' (Income Tax Ordinance, 1984) প্রচলিত ছিল।পটভূমি (Background):করদাতা প্রতিষ্ঠানটি একটি অংশীদারি ফার্ম, যারা মূলত বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ (Supply of goods/Contractor) ব্যবসার সাথে জড়িত। আলোচ্য ২০২১-২০২২ করবর্ষের জন্য তারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করে। পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নির্দেশনায় ফাইলটি অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়।অংশীদারি ফার্মের আয়কর কমপ্লায়েন্স না থাকলে NBR অডিটে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে, এই কেইস স্টাডিটি তার একটি বাস্তব উদাহরণ।১. ফাইলটি কেন অডিটে পড়ল বা অডিটের সূত্রপাত কীভাবে?TDS রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা: করদাতা ফার্ম আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী উৎসে কর কর্তনের (Withholding tax) কোনো বিবরণী বা রিটার্ন দাখিল করেনি।সন্দেহজনক হিসাব বিবরণী: করদাতা তাদের আয়কর রিটার্নের সাথে যে আয়-ব্যয় ও খরচের হিসাব দাখিল করেছিল, তার সাথে ব্যাংকিং লেনদেন ও উৎসে কর কর্তনের যথোপযুক্ত প্রমাণাদি সংযুক্ত ছিল না।২. করদাতার দিক থেকে কী কী ভুল বা ব্যর্থতা ছিল?আয়কর অডিটে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় TDS কর্তন ও ডকুমেন্টেশনের অভাবে। এই কেইসে করদাতার বেশ কিছু গুরুতর ভুল ছিল:শুনানিতে অসহযোগিতা: আয়কর কর্তৃপক্ষ থেকে বারবার শুনানির নোটিশ দেওয়া হলেও করদাতার পক্ষ থেকে কেউ হাজির হয়নি এবং সময়ের জন্য কোনো আবেদনও করেনি। ফলে নথিতে থাকা কাগজপত্রের ভিত্তিতে একতরফা রায় দেওয়া হয়।নগদ লেনদেন (Cash Transactions): আইন অনুযায়ী অফিস ভাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু করদাতা প্রায় ৪ লক্ষ টাকার অফিস ভাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলের বদলে নগদে পরিশোধ করেছে।খরচের সপক্ষে প্রমাণের অভাব (Lack of Vouchers): করদাতা তাদের লাভ-ক্ষতির হিসাবে বিদ্যুৎ বিল (প্রায় ৭৫ হাজার), যাতায়াত (প্রায় ৫০ হাজার), বিবিধ খরচ (প্রায় ৫০ হাজার) এবং স্টেশনারিজ (প্রায় ৭৫ হাজার) দাবি করেছিল। কিন্তু এর সপক্ষে তারা কোনো বিলের কপি বা প্রমাণপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হয়।তথ্য গোপন ও ব্যাংক বিবরণী দাখিল না করা: করদাতা তাদের ব্যাংক সুদ খাতে প্রায় আড়াই লক্ষ (২.৫ লক্ষ) টাকার খরচ দাবি করে। কিন্তু যে ব্যাংকগুলোর বিপরীতে এই সুদ দাবি করা হয়, সেই ব্যাংক হিসাবের কোনো বিবরণী (Bank Statement) তারা দাখিল করেনি।বিক্রয় বা আয়ের অংক গোপন করা (Concealment of Sales): করদাতা তাদের হিসাবে সরবরাহ খাত থেকে প্রাপ্তি বা বিক্রয় দেখিয়েছিল ৪.২০ কোটি টাকা। কিন্তু যে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির কাছে তারা পণ্য সরবরাহ করেছিল, সেই কোম্পানির দেওয়া প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে দেখা যায়, করদাতা আসলে প্রায় ৪.৬৫ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার বিক্রয় তারা রিটার্নে গোপন করেছিল।ব্যাংক জমার সাথে বিক্রয়ের অসামঞ্জস্যতা: করদাতার প্রদর্শিত বিক্রয় ছিল ৪.২০ কোটি টাকা, কিন্তু তাদের প্রদর্শিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর জমা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সেখানে মোট জমার পরিমাণ প্রায় ৪.৪৫ কোটি টাকা, যা বিক্রয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা বেশি। এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকায় অ্যাসেসিং অফিসার প্রায় ১০ লক্ষ টাকাকে 'খুচরা বিক্রয়' হিসেবে প্রাক্কলন করে আয়ের সাথে যোগ করেন।উৎসে কর (TDS) কর্তনে ব্যর্থতা: ফার্মটি প্রায় ৩ কোটি টাকার পণ্য ক্রয় এবং পরিবহন ও মেরামত বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করলেও, বিল পরিশোধের সময় তারা নিয়ম অনুযায়ী কোনো উৎসে কর (TDS) কর্তন করেনি।৩. অ্যাসেসমেন্টের ফলাফল (Assessment Outcome): যেহেতু করদাতা খরচের সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণাদি দাখিল করতে পারেনি, ব্যাংকিং চ্যানেলে ভাড়া পরিশোধ করেনি এবং খরচের বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর (TDS) কর্তন করেনি, তাই অ্যাসেসিং অফিসার আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর বিধান অনুযায়ী এই দাবি করা খরচগুলোকে অগ্রাহ্য (Disallow) করেন। এই বাতিলকৃত খরচের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি টাকার অধিক। এই বিপুল অংকের খরচ বাতিল হওয়ার কারণে ফার্মটির নিরূপিত আয় বহুগুণ বেড়ে যায় এবং এর ওপর ভিত্তি করে একটি বড় অংকের কর দাবি করা হয়।নতুন আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী এই অ্যাসেসমেন্টটি কেমন হতো?উপরোক্ত কেইস স্টাডিটি যদি বর্তমান আয়কর আইন, ২০২৩ এর অধীনে অডিট এবং অ্যাসেসমেন্ট করা হতো, তবে আইনি প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিম্নরূপ হতো:অডিট নির্বাচন ও একতরফা রায় (Best Judgement Assessment): বর্তমানে অডিট প্রক্রিয়াটি ধারা ১৮২ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ফার্মটি যদি অডিটের নোটিশ পেয়ে সহযোগিতা না করত এবং সংশোধিত রিটার্ন দাখিল না করত, তবে উপকর কমিশনার ধারা ১৮৪ এর অধীনে 'সর্বোত্তম বিচারিক কর নির্ধারণ' (Best judgement Assessment) এর মাধ্যমে একতরফাভাবে কর নির্ধারণ করতেন।ভাড়া নগদে পরিশোধ (Cash Transactions): আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ভাড়ার অর্থ ব্যাংক ট্রান্সফার ছাড়া অন্য কোনোভাবে পরিশোধ করলে তা সরাসরি অননুমোদনযোগ্য (Disallowed) ব্যয় হিসেবে বাতিল হয়ে যেত।ভাউচার বা প্রমাণের অভাব: আইন অনুযায়ী, হিসাবের খাতা নির্ধারিত নিয়মে না রাখলে এবং খরচের (বিদ্যুৎ, যাতায়াত, স্টেশনারি ইত্যাদি) সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ বা ভাউচার না থাকলে তা অননুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য হতো।TDS কর্তনে ব্যর্থতা ও 'খেলাপি করদাতা': নতুন আইনের সবচেয়ে কড়া বিধানগুলোর একটি হলো TDS। পণ্য সরবরাহ ও যাতায়াত বা স্টেশনারি খরচের বিপরীতে উৎসে কর কর্তন না করায় আইন অনুযায়ী প্রায় ৩ কোটি টাকার অধিক এই খরচগুলো সম্পূর্ণ বাতিল হতো। শুধু তাই নয়, ধারা অনুযায়ী ফার্মটিকে 'খেলাপি করদাতা' (Assessee-in-default) হিসেবে গণ্য করে, কর্তন না করা করের সমপরিমাণ অর্থ এবং তার ওপর মাসিক ২% হারে অতিরিক্ত জরিমানা আদায় করা হতো।বিশেষ ব্যবসা আয় (Special Business Income): আইনের অধীনে যেসব খরচ বাতিল করা হতো, তা ফার্মের 'বিশেষ ব্যবসা আয়' হিসেবে গণ্য হতো এবং এর বিপরীতে অন্য কোনো ক্ষতি সমন্বয় করা যেত না।আয় বা বিক্রয় গোপন করা (Concealment of Income): ৪৫ লক্ষ টাকার বিক্রয় গোপন এবং ব্যাংক জমার সাথে গরমিলের কারণে এটি 'কর ফাঁকি' হিসেবে বিবেচিত হতো। নতুন আইনের ধারা অনুযায়ী, আয় গোপনের জন্য ফাঁকি দেওয়া করের প্রেক্ষিতে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হতো।TDS রিটার্ন দাখিল না করা: একটি ফার্ম হিসেবে ধারা ১৭৭ অনুযায়ী উৎসে করের রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এটি দাখিল না করার কারণে আইন অনুযায়ী সর্বশেষ কর নির্ধারণের উপরন নির্দিষ্ট হারে এবং প্রতি মাসের বিলম্বের জন্য জরিমানা আরোপিত হতো।এই কেইস স্টাডিটি শুধু একটি ফার্মের গল্প নয় — এটি বাংলাদেশের হাজার হাজার অংশীদারি ফার্ম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বাস্তবতা।আয়কর আইন ২০২৩ পুরনো অধ্যাদেশের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। TDS কর্তন না করা, ভাউচার না রাখা, বা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেন করা — এই ভুলগুলো এখন শুধু খরচ বাতিলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং "খেলাপি করদাতা" হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং কোটি টাকার জরিমানার ঝুঁকি তৈরি করে।আপনার ফার্মের আয়কর অডিট বা অ্যাসেসমেন্ট নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকলে, নোটিশ পাওয়ার আগেই একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবসময় সহজ।

আয়কর অডিট কী? যদি আপনাকে NBR আয়কর অডিটের আওতায় আনা হয় তাহলে কী করবেন — একটি সম্পূর্ণ গাইড
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড পদ্ধতিতে ২০২৩–২০২৪ করবর্ষের বেশ কিছু আয়কর রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করেছে । আপনার ফাইলটি যদি এই তালিকায় থাকে, তবে প্রথমেই বলব — ঘাবড়ানোর বা ভয়ের একেবারেই কিছু নেই।মনে রাখুন: যেহেতু এটি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, তাই এখানে কারো কোনো ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ নেই। এটি শুধুই একটি রুটিন যাচাই প্রক্রিয়া।অনেক করদাতার মনেই প্রশ্ন জাগে — আয়কর অডিট আসলে কী? আজ আমি বিষয়টি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব — অডিট কী , কীভাবে হয় , এবং একজন আয়কর আইনজীবী আপনার স্বার্থ রক্ষায় কী ভূমিকা পালন করেন ।আয়কর অডিট আসলে কী?অডিট মানে কোনো শাস্তি বা জরিমানা নয়। এটি শুধুই একটি যাচাই প্রক্রিয়া। আয়কর রিটার্নে আপনি আপনার আয়, ব্যয় ও সম্পদের যে হিসাব দিয়েছেন, তা বাস্তব তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা — তা দেখাই হলো অডিট।সহজ কথায়: আপনি যে সংখ্যা জমা দিয়েছেন, আয়কর অফিস শুধু তার স্বপক্ষে প্রমাণ দেখতে চাইছে — এটুকুই।অডিট প্রক্রিয়া কীভাবে চলে?আইনের ভাষায় অডিটের বিস্তারিত বিধান থাকলেও, একজন করদাতার দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি সহজ ধাপে সম্পন্ন হয়: ধাপ ১: অডিট সিলেকশন ও প্রাথমিক নোটিশ (Audit Selection & Initial Notice): জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে দাখিলকৃত রিটার্নসমূহ থেকে নির্দিষ্ট কিছু ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচন করে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে পাঠায়। এরপর উপকর কমিশনার (DCT) করদাতাকে অডিট শুরুর বিষয়টি অবহিত করে একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠান। ধাপ ২: তথ্য ও নথিপত্র যাচাই (Inquiry & Verification): কর কমিশনার কর্তৃক গঠিত অনুসন্ধান ও অডিট টিম করদাতার আয়, ব্যয়, ব্যাংক বিবরণী এবং সম্পদের সপক্ষে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র পরীক্ষা করে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা করদাতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারেন। ধাপ ৩: খসড়া অডিট রিপোর্ট ও করদাতার ব্যাখ্যা (Draft Audit Report & Explanation): যাচাই-বাছাই শেষে অডিট টিম একটি 'খসড়া অডিট রিপোর্ট' প্রস্তুত করে করদাতাকে পাঠায়। এই রিপোর্টে যদি কোনো গরমিল বা কর ফাঁকি পাওয়া যায়, তবে করদাতাকে তার সপক্ষে লিখিত ব্যাখ্যা (Written Explanation) দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়। ধাপ ৪: চূড়ান্ত অডিট রিপোর্ট ও সংশোধিত রিটার্ন দাখিল (Final Report & Revised Return): করদাতার ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে বা গরমিল প্রমাণিত হলে চূড়ান্ত অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এরপর উপকর কমিশনার করদাতাকে অডিটের ফাইন্ডিংস অনুযায়ী একটি 'সংশোধিত রিটার্ন' (Revised Return) দাখিল করতে এবং প্রযোজ্য অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার নির্দেশ দেন। এটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করলে অডিটটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যায়।একজন আয়কর আইনজীবী অডিট প্রক্রিয়ায় কীভাবে সাহায্য করেন?অনেক করদাতা মনে করেন নিজে নিজেই অডিট সামলানো সম্ভব। সরল ক্ষেত্রে হয়তো সম্ভব। কিন্তু আয়কর আইন জটিল — এবং যা সহজ মনে হয়, তা আইনিভাবে দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে — বিশেষত যখন আয়কর অফিস আপনার রিটার্নকে আপনার উদ্দেশ্য থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।এখানেই একজন নিবন্ধিত আয়কর আইনজীবীর ভূমিকা শুরু হয়।আইনি প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করাঃ আয়কর আইনের ধারা ৩২৭ অনুযায়ী, একজন করদাতা তার পক্ষে কথা বলার জন্য একজন অনুমোদিত প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন। আপনার আয়কর আইনজীবীর প্রথম দায়িত্ব হলো আপনার হয়ে NBR-এর সাথে সমস্ত আইনি যোগাযোগ পরিচালনা করা এবং পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে আপনার আইনি অধিকার সুরক্ষিত রাখা।সঠিক কাগজপত্র গুছিয়ে উপস্থাপন করাঃ NBR ঠিক কী কাগজপত্র চাইছে এবং আইনি মানদণ্ড পূরণ করে কীভাবে তা উপস্থাপন করতে হবে — এটি একটি বিশেষ দক্ষতার বিষয়। আপনার আয়কর আইনজীবী প্রযোজ্য আইনের আলোকে চাহিদা বিশ্লেষণ করেন এবং আপনার ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সম্পত্তির দলিল ও আর্থিক রেকর্ড সঠিকভাবে গুছিয়ে উপস্থাপন করেন।আইনি ব্যাখ্যা প্রদানঃ অডিটের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি হলো — করদাতার সম্পূর্ণ বৈধ আয় থাকলেও তা রিটার্নের ভুল অংশে দেখানো হয়েছে। তখন আয়কর অফিস সেটিকে অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে গণ্য করতে পারে — যা একটি গুরুতর সমস্যা। একজন আয়কর আইনজীবী আইনের সঠিক ধারা উল্লেখ করে লিখিত আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন এবং প্রমাণ করতে পারেন যে আপনার আয় যথাযথভাবে হিসাবভুক্ত।সংশোধিত রিটার্ন প্রস্তুত বা আপিল দায়ের করাঃ অডিট শেষে সংশোধিত রিটার্ন জমা দিতে বলা হলে, আপনার আয়কর আইনজীবী আরও জটিলতা এড়াতে সেটি নির্ভুলভাবে প্রস্তুত করবেন। আর যদি আয়কর অফিস আপনার অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনা না করে অন্যায্য কর চাপিয়ে দেয়, তাহলে তিনি ট্রাইব্যুনালে বা উচ্চতর আদালতে আপিল দায়ের করবেন এবং আপনার পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।একজন সৎ করদাতার অডিটকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনার আয়, ব্যয় এবং সম্পদ যদি রিটার্নে সঠিকভাবে প্রদর্শিত হয়, তাহলে অডিট শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা — এটি কোনো হুমকি নয়, শুধুই একটি প্রক্রিয়া।এনবিআর এর অডিট লিস্টে আপনার রিটার্নটি আছে কিনা চেক করুন আমার ফ্রি অডিট চেকার টুলের মাধ্যমেঃ https://mahmudulhasanbijoy.online/nbr-return-audit-checker/

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আয়কর
ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান ও সম্মানিত পেশা হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার পেশাদার আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য দূর থেকে কাজ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন — যা জাতীয় অর্থনীতিতে অর্থপূর্ণ অবদান রাখছে। তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে: বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের কি আয়কর দিতে হবে?এর উত্তরটি বেশিরভাগ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম — এবং অনেক বেশি সুবিধাজনক। এই নির্দেশিকায়, আমি ব্যাখ্যা করব বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আয়কর সম্পর্কে বর্তমান আইন ঠিক কী বলে, কী কী শর্ত প্রযোজ্য এবং আপনার কী কী নথি সংরক্ষণ করতে হবে।বড় খবর: ২০২৭ সাল পর্যন্ত আইটি ফ্রিল্যান্সিং আয় ১০০% করমুক্তএখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি রয়েছে যা প্রত্যেক বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সারের জানা উচিত: বর্তমান আইন অনুযায়ী আইটি ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয় আয়কর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আয়কর আইন ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, আবাসিক বা অনাবাসিক বাংলাদেশী ব্যক্তি করদাতাদের আয়কর ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয় ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত।এখানে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে: পূর্বে প্রস্তাবিত বাজেটে শুধুমাত্র "আইটি ফ্রিল্যান্সিং" (IT Freelancing)-এর জন্য এই ছাড় দেওয়ার কথা বলা হলেও, চূড়ান্ত গেজেটে পরিধি আরও বাড়িয়ে সাধারণ "ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) এবং ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন (Content Creation)" থেকে অর্জিত আয়কেও সম্পূর্ণ করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে! একই সাথে, চূড়ান্ত গেজেটের দ্বিতীয় অধ্যায় অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের প্রদত্ত সেবাকে সম্পূর্ণ ভ্যাট (VAT) মুক্ত করা হয়েছে।এটি একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা যা বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের অন্যান্য স্বনির্ভর পেশাজীবীদের তুলনায় অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। তবে, এই ছাড়টি শর্তসাপেক্ষ।কর ছাড়ের জন্য যোগ্যতার শর্তাবলী:বাংলাদেশে ১০০% আইটি ফ্রিল্যান্সিং কর ছাড় দাবি করার জন্য, আপনাকে দুটি বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত পূরণ করতে হবে:আয়ের ১০০% অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসতে হবে: আইটি ফ্রিল্যান্সিং ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পূর্ণ আয় অবশ্যই ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসতে হবে। নগদে ফ্রিল্যান্স পেমেন্ট গ্রহণ করলে আপনি এই ছাড়ের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।বৈদেশিক আয় অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসতে হবে: যেহেতু বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে আসে, তাই বিদ্যমান বৈদেশিক রেমিটেন্স আইন অনুযায়ী তা অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠাতে হবে। অনানুষ্ঠানিক স্থানান্তর পদ্ধতি (হুন্ডি, ক্রিপ্টো, ইত্যাদি) আপনাকে এই ছাড়ের জন্য অযোগ্য করে তুলবে।ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি নথি (Documents to Preserve):Foreign Inward Remittance Certificate (FIRC): ব্যাংক থেকে পাওয়া রেমিট্যান্সের মূল সার্টিফিকেট বা বিবরণী, যা প্রমাণ করে যে আপনার টাকা সরাসরি বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে।ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট (Bank Statement): যে অ্যাকাউন্টে ফ্রিল্যান্সিং বা কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের অর্জিত টাকা সরাসরি জমা হয়েছে তার বিস্তারিত ব্যাংক স্টেটমেন্ট।মার্কেটপ্লেসের ইনভয়েস ও প্রোফাইল রিপোর্ট: Upwork, Fiverr বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মের আর্নিং হিস্ট্রি (Earning History), কাজের ইনভয়েস বা চুক্তিপত্র।

২০২৩-২০২৪ কর বছরের আয়কর রিটার্ন Audit: NBR এর স্বয়ংক্রিয় রাডারে ৬০,০০০টি ফাইল!
গত ৩১ মার্চ রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরপরই এনবিআর তাদের অডিট কার্যক্রম নিয়ে কড়াকড়ির ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, খুব শিগগিরই ২০২৩-২৪ করবর্ষের আয়কর রিটার্নগুলোর ডাটা-ভিত্তিক অডিট কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।একজন কর আইনজীবী হিসেবে এই অডিট কার্যক্রমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক এবং এর মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে আপনাদের সচেতন করতে চাই:অডিটের পরিধি বেড়েছে প্রায় পৌনে চার গুণ (৩.৭৫x): আগের বছর যেখানে অডিট ফাইলের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬,০০০; সেখানে এবার প্রায় ৬০,০০০ রিটার্ন অডিটের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।ম্যানুয়াল নয়, ডাটা-ভিত্তিক (Risk-Based) অডিট: এখন আর এলোমেলোভাবে ফাইল বাছাই করা হচ্ছে না। আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ 'অটোমেটেড রিস্ক অ্যানালাইসিস'-এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ফাইলগুলো টার্গেট করা হচ্ছে।ঝুঁকিতে থাকতে পারেন কারা?যারা শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে রিটার্ন দাখিল করেছেন।যাচাই-বাছাই ছাড়া সাধারণ কম্পিউটার দোকান থেকে ফাইল সাবমিট করেছেন, যেখানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।আয়ের সাথে সম্পদের বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ইত্যাদি।অডিট নোটিশ পেলে একজন আয়কর আইনজীবী কীভাবে সহায়তা করেন?অডিটে নাম আসা মানেই যে আপনি অপরাধী বা বিশাল জরিমানা দিতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। তবে নোটিশ পেলে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একজন অভিজ্ঞ কর আইনজীবী মূলত যে বিষয়গুলোতে আপনাকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে থাকেনঃডকুমেন্টেশন ও ব্যাখ্যা প্রদান: এনবিআরের দাবিকৃত তথ্যের বিপরীতে সঠিক আইনি ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় দলিলাদি (Supporting Documents) প্রস্তুত করা।অডিট শুনানি (Hearing): করদাতার পক্ষে শুনানিতে অংশগ্রহণ করে আইনের সঠিক ধারা উল্লেখপূর্বক ফাইলের স্বচ্ছতা প্রমাণ করা।অযৌক্তিক জরিমানা রোধ: উপকর কমিশনার (DCT) কর্তৃক কোনো অযৌক্তিক কর বা জরিমানা আরোপিত হলে, তার বিরুদ্ধে আপিল (Appeal) ও ট্রাইব্যুনালে আইনি লড়াই পরিচালনা করা, এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম।যাঁরা সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায় এবং নির্ভুল তথ্য দিয়ে রিটার্ন দাখিল করেছেন, তাঁদের এই অডিট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।সঠিক তথ্য জানুন, আইনি ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন।

আয়কর ব্যবস্থায় নতুন রূপরেখার আভাস: কোন পথে এগোচ্ছে NBR?
সম্প্রতি গণমাধ্যমে এনবিআর চেয়ারম্যান মহোদয়ের কিছু বক্তব্য থেকে আমাদের রাজস্ব খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।যদিও বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত আইনে পরিণত হয়নি বা বাজেটে পাস হয়নি, তবে এনবিআর আগামী দিনে কোন কৌশলে এগোতে চাচ্ছে—তার একটি পরিষ্কার ধারণা এখান থেকে পাওয়া যায়। যেমনঃ সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ এবং প্রণোদনার পরিকল্পনা: আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় ডেডলাইনের শেষ মুহূর্তে সার্ভার জটিলতা এবং করদাতাদের প্যানিক একটি সাধারণ চিত্র। এনবিআর চেয়ারম্যান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী অর্থবছর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে সারা বছরই অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হতে পারে।সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের জন্য 'বিশেষ প্রণোদনা' বা ইনসেনটিভ রাখার একটি পরিকল্পনা এনবিআরের রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কর ব্যবস্থায় শুধু 'শাস্তির' বদলে 'পুরস্কারের' একটি পজিটিভ সংস্কৃতি তৈরি হবে।উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে কর (Inheritance Tax) আরোপের চিন্তাভাবনা: এটি সম্ভবত সবচেয়ে বড় আইনি পরিবর্তনের আভাস। আমাদের দেশে বর্তমানে পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ওপর আলাদা করে কোনো আয়কর দিতে হয় না। তবে এনবিআর এখন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর কর আরোপের বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা করছে।তবে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, এনবিআর এখন শুধু কর আদায়ের দিকে নয়, বরং একটি 'স্মার্ট এবং স্ট্র্যাটেজিক ট্যাক্সেশন' ইকোসিস্টেম গড়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।বিশেষ করে, 'উত্তরাধিকার কর' (Inheritance Tax)-এর প্রস্তাবনাটি যদি ভবিষ্যতে আইনে পরিণত হয়, তবে পারিবারিক সম্পদ বণ্টন বা 'অ্যাসেট ট্রান্সফার'-এর ক্ষেত্রে গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদী এবং সঠিক আইনি পরিকল্পনার (Tax & Estate Planning) প্রয়োজন হবে।

২০২৫-২০২৬ করবর্ষের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত সময়সীমা গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হয়েছে
গতকাল ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে ২০২৫-২০২৬ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমার সময়সীমা শেষ হয়েছে। যারা অনলাইনে সময় বৃদ্ধির আবেদন (Time Petition) করে অনুমোদন পেয়েছেন, তারা আপাতত শান্তিতে আছেন।কিন্তু যারা আবেদন করেননি এবং রিটার্নও জমা দেননি, তাদের ফাইলটি এখন আয়কর আইন ২০২৩-এর ১৭৪ ধারার (Section 174) অধীনে চলে গেছে।অনেকেই ভাবেন, "দেরি হয়েছে তো কী! সামান্য কিছু লেট ফাইন বা সুদ দিয়ে রিটার্নটা জমা দিয়ে দেব। আমার তো ডিপিএস আর সঞ্চয়পত্র আছে, রিবেট নিয়ে ট্যাক্স জিরো করে ফেলব।"আর এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা! (The Real Trap of Section 174):১৭৪ ধারায় রিটার্ন দাখিল করলে আপনাকে শুধু যে বিলম্ব সুদ (প্রতি মাসে ২%) এবং এককালীন জরিমানা দিতে হবে, তা কিন্তু নয়। এর চেয়েও বড় আর্থিক ক্ষতিটি হলো—আপনি আপনার 'বিনিয়োগ রেয়াত' বা Investment Rebate এর আইনি অধিকার হারাবেন!আয়কর আইন অনুযায়ী, আপনি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (বা অনুমোদিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে) রিটার্ন দাখিল না করেন, তবে আপনি ষষ্ঠ তফসিলের অংশ-৩ অনুযায়ী কোনো কর রেয়াত দাবি করতে পারবেন না।ধরুন,, মাত্র ৩ মাস দেরির কারণে আপনার পকেট থেকে ঠিক কত টাকা বাড়তি যাবে:সময়মতো (৩১ মার্চের মধ্যে) রিটার্ন দিলেঃমোট কর: ৫০,০০০ টাকাকর রেয়াত (বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত): ৫,০০০ টাকাচূড়ান্ত প্রদেয় কর: ৪৫,০০০ টাকা৩ মাস দেরিতে (১৭৪ ধারায়) রিটার্ন দিলে: দেরিতে রিটার্ন দেওয়ার কারণে আপনার ওই ৫,০০০ টাকার কর রেয়াতটি প্রথমেই বাতিল হয়ে যাবে। রেয়াত বাতিল হওয়ার পর -প্রদেয় কর: ৫০,০০০ টাকা৩ মাসের বিলম্ব সুদ (মাসিক ২% হারে): ৫০,০০০ × ৩ মাস × ২% = ৩,০০০ টাকাচূড়ান্ত প্রদেয় কর: ৫৩,০০০ টাকা (হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নেওয়া হয়েছে আপনার আগে থেকে কোনো অগ্রিম কর বা উৎসে কর দেওয়া নেই)ফলাফল কী দাঁড়ালো? সময়মতো রিটার্ন দিলে যেখানে আপনার ট্যাক্স আসতো ৪৫,০০০ টাকা, সেখানে মাত্র ৩ মাস দেরির কারণে আপনাকে দিতে হচ্ছে ৫৩,০০০ টাকা! অর্থাৎ স্রেফ অবহেলার কারণে আপনার নিট লোকসান হলো ৮,০০০ টাকা। আর উপকর কমিশনার চাইলে এর সাথে আলাদা জরিমানাও যোগ করতে পারেন।সুতরাং, যেহেতু ডেডলাইন পার হয়ে গেছে, তাই এখন এনবিআর থেকে নোটিশ (Notice) আসার আগেই স্বপ্রণোদিত হয়ে (Voluntarily) ১৭৪ ধারায় রিটার্নটি দাখিল করে ফেলুন। এতে অন্তত মাসের পর মাস বাড়তে থাকা 'বিলম্ব সুদ' থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।১৭৪ ধারায় জরিমানা, সুদ এবং রেয়াত বাতিলের সঠিক হিসাবটি বুঝতে আজই একজন অভিজ্ঞ ট্যাক্স প্রফেশনালের সাথে যোগাযোগ করুন। ড্যামেজ কন্ট্রোল করাটাই এখন সবচেয়ে বড় ট্যাক্স প্ল্যানিং!

আয়কর রিটার্নে 'সারচার্জ' এবং 'পরিবেশ সারচার্জ
আয়কর শুধু আপনার আয়ের ওপর নির্ভর করে না; আপনি কতটুকু সম্পদের মালিক এবং আপনার লাইফস্টাইল কেমন, তার ওপর ভিত্তি করে এনবিআর (NBR) আপনার ওপর অতিরিক্ত 'সারচার্জ' আরোপ করে। সম্পদ সারচার্জ (Wealth Surcharge) - লুকানো ফাঁদ কোথায়? (৩০শে জুন ২০২৬ এ প্রকাশিত অর্থ আইন ২০২৬ অনুসারে))অনেকেই মনে করেন, "আমার তো ৪ কোটি টাকার সম্পদ নেই, তাই সারচার্জ নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।" কিন্তু আইনের আসল মারপ্যাঁচটা অন্য জায়গায়।০% সারচার্জ: নিট সম্পদ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে কোনো সারচার্জ নেই।১০% সারচার্জ (সবচেয়ে বড় ট্র্যাপ!): নিট সম্পদ ৪ থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে হলে ১০% সারচার্জ দিতে হবে। ২০% সারচার্জ: নিট সম্পদ ১০ থেকে ২০ কোটি টাকা হলে।৩০% সারচার্জ: নিট সম্পদ ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকা হলে।৩৫% সারচার্জ (সর্বোচ্চ): নিট সম্পদ ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে।তবে— আপনার সম্পদ যদি ৪ কোটির নিচেও হয়, কিন্তু আপনার নামে একাধিক গাড়ি থাকে অথবা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৮,০০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের প্রপার্টি থাকে, তাহলেও আপনাকে বাধ্যতামূলক ১০% সারচার্জ দিতে হবে!পরিবেশ সারচার্জ (Environmental Surcharge):এটি মূলত তাদের জন্য, যাদের নামে একাধিক গাড়ি (Passenger Car) রয়েছে। দ্বিতীয় বা তার পরবর্তী প্রতিটি গাড়ির ইঞ্জিনের সিসি (CC) অনুযায়ী এই সারচার্জ দিতে হয়ঃ১৫০০ সিসি পর্যন্ত: ২৫,০০০ টাকা১৫০১ সিসি - ২০০০ সিসি: ৫০,০০০ টাকা২০০১ সিসি - ২৫০০ সিসি: ৭৫,০০০ টাকা২৫০১ সিসি - ৩০০০ সিসি: ১,৫০,০০০ টাকা৩০০১ সিসি - ৩৫০০ সিসি: ২,০০,০০০ টাকা৩৫০০ সিসির বেশি: ৩,৫০,০০০ টাকাকৌশলগত পরামর্শ (Tactical Insight for Clients):অনেক ক্লায়েন্ট শখ করে নিজের নামে একাধিক গাড়ি কেনেন। কিন্তু তারা জানেন না যে, দ্বিতীয় গাড়ি কেনার সাথে সাথেই তাদের দুটি বড় ধাক্কা খেতে হয়: ১. আয়ের ওপর ১০% সম্পদ সারচার্জ (এমনকি সম্পদ ৪ কোটির কম হলেও)। ২. গাড়ির সিসি অনুযায়ী অতিরিক্ত 'পরিবেশ সারচার্জ'।সমাধান (The Hook): পরিবারে যদি অন্য কোনো করদাতা (যেমন: স্ত্রী বা স্বামী) থাকেন, তবে ট্যাক্স প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে লিগ্যাল ওয়েতে এই সারচার্জগুলো এড়ানো বা কমানো সম্ভব। সম্পদ বা গাড়ি কেনার আগে আপনার ট্যাক্স কনসালট্যান্টের সাথে বসে 'অ্যাসেট অ্যালোকেশন' (Asset Allocation) ঠিক করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

ই-রিটার্ন (eReturn) পোর্টাল থেকে ঘরে বসেই রিটার্ন জমার সময় বাড়িয়ে নিন
যাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬, কিন্তু এখনও সব ডকুমেন্টস গোছানো হয়নি কিংবা অন্যান্য কারণে মনে হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবার রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভভ নাও হতে পারে - তাদের জন্য এনবিআর একটি দুর্দান্ত আপডেট এনেছে ।আগে সময় বাড়ানোর জন্য সার্কেল অফিসে গিয়ে লিখিত আবেদন করতে হতো । কিন্তু এখন, আপনি চাইলেই ই-রিটার্ন (e-Return) পোর্টাল থেকে ঘরে বসেই অতিরিক্ত ৯০ দিন পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করতে পারবেন ।কীভাবে করবেন? নিচে একদম সহজ ধাপগুলো দেওয়া হলো:Step 1: লগইন করুনঃপ্রথমে এনবিআর-এর ই-রিটার্ন পোর্টালে (etaxnbr.gov.bd) যান। আপনার TIN এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে পোর্টালে লগইন করুন। (যাদের রেজিস্ট্রেশন নেই, তাদের আগে রেজিস্ট্রেশন করে নিতে হবে )।Step 2: 'Time Extension মেন্যু খুঁজুনঃলগইন করার পর, ড্যাশবোর্ডের বাম পাশের মেন্যুবারে লক্ষ্য করুন। সেখানে নতুন যুক্ত হওয়া "Time Extension" অপশনটি দেখতে পাবেন । সেটিতে ক্লিক করুন।Step 3: আবেদন ফর্ম পূরণঃএখানে আপনাকে কিছু বেসিক তথ্য দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—"Reason for Extension" (সময় বৃদ্ধির কারণ)যথাযথ কারণ (যেমন: ব্যাংক স্টেটমেন্ট পেতে বিলম্ব, হিসাব চূড়ান্ত না হওয়া, অসুস্থতা ইত্যাদি) সংক্ষেপে এবং স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।Step 4: কত দিনের সময় চাইছেন? আপনি সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত সময় চাইতে পারেন । আপনার কতদিন সময় লাগবে, সেটি উল্লেখ করুন।Step 5: সাবমিট করুনঃসব তথ্য ঠিক থাকলে 'Submit' বাটনে ক্লিক করুন। আপনার আবেদনটি সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের কর কমিশনারের কাছে অনলাইনে চলে যাবে ।Step 6: স্ট্যাটাস চেক করুনঃকিছুদিন পর পোর্টালেই আপনি দেখতে পাবেন আপনার আবেদনটি মঞ্জুর (Approved) হয়েছে নাকি নামঞ্জুর (Rejected) হয়েছে । মঞ্জুর হলে, আপনি কোনো জরিমানা ছাড়াই বর্ধিত সময়ের মধ্যে আপনার রিটার্ন সাবমিট করতে পারবেন ।

Zero Return মানেই কি আপনি ১০০% নিরাপদ? নাকি ভবিষ্যতের বড় কোনো ফাঁদ?
সাধারণ মানুষ ভাবেন: "আমার তো করযোগ্য আয় নেই, অথবা শুধু ক্রেডিট কার্ড বা সঞ্চয়পত্রের জন্য টিন (TIN) খুলেছি। তাই অনলাইনে বা এজেন্টের মাধ্যমে একটা জিরো রিটার্ন জমা দিয়ে দিলাম। ঝামেলা শেষ, আমি সেফ!"কিন্তু একজন আয়কর আইনজীবী হিসেবে আমি বলব—না বুঝে বছরের পর বছর 'জিরো রিটার্ন' দেওয়াটা আপনার আর্থিক জীবনের অন্যতম বড় ভুল হতে পারে। কেন:১. ভবিষ্যতের সম্পদ ক্রয় (The Source of Fund Trap): ধরুন, আজ থেকে ৩-৪ বছর পর আপনি একটি ফ্ল্যাট, জমি বা ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন। তখন রেজিস্ট্রেশনের সময় আপনাকে টাকার আইনি উৎস বা 'Source of Fund' দেখাতে হবে। আপনি যদি গত কয়েক বছর ধরে ফাইলে দেখান যে আপনার আয় শূন্য, তাহলে এনবিআর প্রশ্ন করব"আপনার তো ফাইল অনুযায়ী খাওয়ার টাকাই ছিল না! তাহলে আজ হঠাৎ এই ৫০ লাখ বা ১ কোটি টাকা পেলেন কোথা থেকে?"২. অপ্রদর্শিত আয়ের জরিমানা (Penalty for Undisclosed Income): যদি আপনি তখন সঠিক উৎস (Source) দেখাতে না পারেন, তবে ওই সম্পদের পুরো টাকাটাই "অপ্রদর্শিত আয়" বা কালোটাকা হিসেবে গণ্য হবে। তখন আপনাকে ওই টাকার ওপর বিশাল জরিমানাসহ ট্যাক্স দিতে হবে, যা স্বাভাবিক ট্যাক্সের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি!৩. ব্যাংক লোন এবং ভিসা রিজেকশন: আপনি যদি ভবিষ্যতে ব্যাংকে হোম লোন বা বিজনেস লোনের জন্য যান, ব্যাংক সবার আগে আপনার ট্যাক্স ফাইল দেখবে। ফাইলে ক্রমাগত 'জিরো রিটার্ন' দেখলে ব্যাংক ধরে নেবে আপনার আয় ও ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা (Repayment Capacity) নেই। ফলে লোন পাস হবে না। উন্নত দেশের ভিসার ক্ষেত্রেও এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।কৌশলগত পরামর্শ (কী করবেন?): আপনার আয় যদি সত্যিই করযোগ্য সীমার নিচে থাকে, তবে জিরো ট্যাক্স দেওয়া কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু আপনি যদি ভবিষ্যতে বড় কোনো সম্পদ কেনার বা লোনের প্ল্যান করেন, তবে এখন থেকেই ফাইলে বৈধ আয় (Legal Income) দেখিয়ে একটু একটু করে "Capital" বা "হোয়াইট মানি" গঠন করা উচিত।সামান্য কিছু ট্যাক্স দিয়ে যদি ভবিষ্যতে কোটি টাকার সম্পদ আইনি ঝামেলা ছাড়াই নিরাপদে কেনা যায়, তবে সেটাই হলো স্মার্ট ট্যাক্স প্ল্যানিং! টিআইএন (TIN) আছে মানেই শুধু 'শূন্য' লিখে সাবমিট করা নয়। বছর শেষে কেবল ফর্ম পূরণ না করে, আপনার ফাইলের একটি 'ফাইন্যান্সিয়াল রোডম্যাপ' তৈরি করুন।